প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজউকের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে সর্বশেষ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে চলমান এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে আজকের দিনটিকে দেখা হচ্ছে বিচার-পর্যবেক্ষকদের চোখে। বুধবার (২৯ অক্টোবর) সকাল থেকেই ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আদালতে উপস্থিত রয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, যিনি দুদকের পক্ষ থেকে এই মামলার শেষ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেবেন বলে জানা গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা একাধিক নথিপত্র, জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আজ আদালতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করবেন। এই সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মূলত সাক্ষ্যপর্ব শেষ হবে এবং এরপর শুরু হবে আসামিপক্ষের জেরা ও যুক্তিতর্ক পর্ব।
এদিকে একই আদালতে আজ আরেকটি সংশ্লিষ্ট মামলারও সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে, যেখানে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটির আজ সপ্তম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে শেখ হাসিনা নিজের প্রভাব খাটিয়ে, সরকারি বিধি-বিধান উপেক্ষা করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একটি বড় আকারের প্লট বরাদ্দ নিয়েছিলেন। একই প্রক্রিয়ায় তার ছেলে ও মেয়ের নামেও আরও দুটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই বরাদ্দগুলো সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত নীতিমালা ও লটারির নিয়ম লঙ্ঘন করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করছে দুদক।
২০১৯ সালের শেষের দিকে প্রথম এই অভিযোগ ওঠে গণমাধ্যমে। পরবর্তীতে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর দুদক তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করে। মামলাগুলোর মোট আসামির সংখ্যা ৪৭, যার মধ্যে রাজউকের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মচারী ও কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও রয়েছেন।
মামলার নথিতে উল্লেখ আছে, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়ার জন্য লটারির প্রক্রিয়াই ছিল একমাত্র উপায়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষভাবে ‘ব্যতিক্রমী নথি’ তৈরি করা হয়, যাতে তাদের আবেদন অগ্রাধিকার পায় এবং নির্দিষ্ট প্লটগুলো বরাদ্দের অনুমোদন দ্রুত দেওয়া হয়। তদন্তে দেখা গেছে, বরাদ্দের সময় জমির মূল্য ও হস্তান্তর ফি সংক্রান্ত নিয়মও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলাটির প্রাথমিক পর্যায়ে ৬৪টি সরকারি নথি ও দলিল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৭ জন সাক্ষী ইতোমধ্যে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তারা। তাদের অধিকাংশই স্বীকার করেছেন যে, প্লট বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় ‘উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা’ ছিল।
আজকের সাক্ষ্যগ্রহণে দুদকের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, “এই মামলাটি বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকে কেউ যদি নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকেন, তবে সেটির জবাবদিহি অবশ্যই হতে হবে। আজকের সাক্ষ্য আদালতের সিদ্ধান্তের পথে শেষ ধাপ খুলে দেবে।”
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার আইনজীবীরা দাবি করছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। তাদের ভাষ্য, “এ মামলার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কোনো বেআইনি সুবিধা নেননি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তিনি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজে তদারকি করেছেন।”
বিচারক মো. জাহিদুল ইসলাম আজ সকালে শুনানি শুরুর আগে বলেন, “আদালত কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় দেখে রায় দেবে না। আইন ও প্রমাণ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিচারপতি মামলার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
রাজধানীর বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালত প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এদিকে, শেখ হাসিনার সমর্থক ও বিরোধী দুই পক্ষেরই কিছুসংখ্যক মানুষ আদালতের বাইরে অবস্থান নেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলাটি শুধু একটি দুর্নীতির মামলা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক স্পর্শকাতর অধ্যায় হয়ে উঠেছে। কারণ, এখানে শুধু একটি প্লট বরাদ্দের বিষয় নয়—রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রভাব, জবাবদিহি এবং আইনসভার ভারসাম্যের বিষয়ও জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে শেখ হাসিনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর তার বিরুদ্ধে আনীত এই অভিযোগ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একপক্ষ বলছে, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানের প্রমাণ, অন্যপক্ষ বলছে, এটি প্রতিহিংসার রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
আজকের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলার সাক্ষ্যপর্ব শেষ হলে আদালত যুক্তিতর্কের তারিখ ঘোষণা করবে। এরপরই নির্ধারিত হবে রায়ের সময়। বিচার-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যদি সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোয়, তবে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকেই এই মামলার রায় ঘোষণা করা হতে পারে।
এই মামলার ফলাফল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ, শেখ হাসিনা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, বরং তিনি এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যার প্রতিটি পদক্ষেপ দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে।
সবশেষে বলা যায়, আজকের এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। আদালতের রায় যেদিকেই যাক, এই মামলাটি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতা ও ন্যায়ের ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেবে—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।