প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫, বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বুধবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে তিন দফা গুরুত্বপূর্ণ দাবি উপস্থাপন করেছে। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জুলাই সনদ শুধুমাত্র রাজনৈতিক সমঝোতার একটি দলিল নয়; এটি কার্যকর হওয়ার জন্য অবশ্যই আইনি ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে দলের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, এনসিপি দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থান বজায় রেখেছে যে, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার আগে এর আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। দলের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “আমরা বরাবর বলেছি, জুলাই সনদ কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার ফাঁকা বুলি নয়; এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আইনি ভিত্তি থাকা অত্যাবশ্যক। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া পর্যবেক্ষণ করে সনদে স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেব।”
এনসিপি তাদের অবস্থান কঠোর রাখায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা সুপারিশ করেছে। দলের বক্তব্যে বলা হয়েছে, “এনসিপির আপসহীন অবস্থানের ধারাবাহিকতার ফলেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা সুপারিশ করতে পেরেছে। আমরা কমিশনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।”
সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, কমিশন দুই ধরনের সংস্কারের জন্য স্বতন্ত্র বাস্তবায়ন রূপরেখা তৈরি করেছে। একটি সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার, আরেকটি সংবিধান সম্পর্কিত নয় এমন অন্যান্য সংস্কার। সংবিধান সম্পর্কিত নয় এমন সংস্কারগুলোর জন্য প্রজ্ঞাপন ও অধ্যাদেশের খসড়া সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। এনসিপি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
দলটির বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তত ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নের জন্য কমিশন দুটি পৃথক খসড়া প্রস্তাব করেছে। এনসিপি মনে করে, প্রথম খসড়া অর্থাৎ প্রস্তাব-১ বাস্তবায়নের পথেই সরকারকে অগ্রসর হতে হবে। কারণ এখানে ৮(ঙ) ধারায় বলা হয়েছে, যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্য সম্পন্ন করতে না পারে, তবে ধারা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনরূপে কার্যকর হবে। দলের যুক্তি অনুযায়ী, এটি সনদে গণভোটের ম্যান্ডেট কার্যকর করার জন্য অত্যাবশ্যকীয়, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রয়োগের নজির রয়েছে।
অন্যদিকে, কমিশনের প্রস্তাবিত প্রস্তাব-২-তে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই, যার কারণে গোটা সংবিধান সংশোধন কার্যক্রম ভণ্ডুল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই সরকারকে কমিশন প্রস্তাবিত প্রস্তাব-১ বাস্তবায়ন রূপরেখা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া প্রস্তাব-১-এর কিছু ধারা ভাষাগতভাবে অস্পষ্ট, যা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচিত সভা সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ “পারিবে”, যা পরিবর্তন করে “করিবে” করা প্রয়োজন। ৮(ঘ) ধারায় সংবিধান সংস্কার বিলের বিষয়াদি “বিবেচনা করিবে” শব্দটি অস্পষ্টতা সৃষ্টি করছে; এটি পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রধান দাবি হিসেবে এনসিপি উল্লেখ করেছে, গণভোটে প্রদত্ত সংবিধান সংস্কার বিলের খসড়া দ্রুত প্রণয়ন ও জনগণের কাছে উন্মুক্ত করতে হবে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এই ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনসিপি আরও আশ্বাস দিয়েছে, সরকার যদি এই প্রস্তাবগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়, তবে জুলাই সনদ শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি হিসেবে থাকবে না; বরং তা বাস্তব কার্যক্রমে রূপান্তরিত হবে। দলের বিশ্বাস, এটি দেশের সংবিধান সংশোধনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার জন্য অপরিহার্য।
দলের নেতারা বলেছেন, সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও যৌথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয় ঐকমত্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। তারা আরও যুক্তি দিয়েছে, জুলাই সনদ কার্যকর না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ধীরগতি ঘটতে পারে। তাই সরকার ও সকল রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এনসিপি এই সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, তারা আইনগত ভিত্তি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা দলিলকে সমর্থন করবে না। দলের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের স্বীকৃতি ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবিত প্রস্তাব-১ বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক। দলটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে জাতীয় ঐকমত্য ও সংবিধান সংশোধনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এভাবে তিন দফা দাবির মধ্যে আইনগত ভিত্তি নিশ্চিত করা, সংবিধান সংস্কার বিলের খসড়া দ্রুত প্রণয়ন ও জনগণের কাছে উন্মুক্ত করা এবং প্রস্তাব-১-এর ভাষাগত অস্পষ্টতা নিরসনসহ বাস্তবায়ন রূপরেখা গ্রহণ করা বিষয়গুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে জুলাই সনদ কার্যকর ও প্রভাবশালী হতে পারবে। এনসিপি মনে করছে, এই পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সনদ কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে থেকে যাবে, যা দেশের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।