প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫, বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজা: যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকলেও গাজায় ইসরাইলি হামলার ধ্বংসলীলার মাত্রা কমেনি। মঙ্গলবার রাতভর ইসরাইলি বিমান ও ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯১ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে ২৪ জন শিশু, যা সাম্প্রতিক সময়ের সংঘর্ষে সবচেয়ে বড় মানবিক ক্ষতির ইঙ্গিত বহন করছে। ঘটনাস্থল থেকে আল জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।
দক্ষিণ রাফাহ এলাকায় রাতভর গুলি বিনিময়ের পর ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্দেশে ব্যাপক হামলা চালায়। এই সংঘর্ষে এক ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মধ্য গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ৪২ জনের মধ্যে ১৮ জন একই পরিবারের সদস্য। এছাড়া দক্ষিণ গাজায় ১৮ জন এবং উত্তর গাজায় ৩১ জন নিহত হয়েছে।
গাজা সিটির পশ্চিমে অবস্থিত শাতি শরণার্থী শিবির ইসরাইলি বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহের পূর্ববর্তী এলাকাগুলোও কামানের গোলাবর্ষণের মাধ্যমে লক্ষ্য করা হয়েছে। গাজা সিটির শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের আশেপাশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে চিকিৎসা কার্যক্রমের প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই হামলায় গাজা সিটির আবাসিক এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক ফিলিস্তিনি আটকা পড়েছে। স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা রাতভর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবন ও মৃত্যু নিরূপণ করার চেষ্টা করছেন। তবে নিরাপত্তার কারণ ও স্থলসীমার ক্ষতি বড় হওয়ায় উদ্ধার অভিযান সীমিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই এই হামলাকে ঘোরতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। শিশু ও নিরীহ নাগরিকদের বড় ধরনের ক্ষতি হলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। গাজা অঞ্চলে হামলা চালানোর ফলে চিকিৎসা, খাদ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চরম চাপের মুখে পড়েছে।
হামলার ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন। জাপান থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছেন, গাজার সাম্প্রতিক হামলার বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং ইসরাইলিরা পাল্টা প্রতিরক্ষা করেছে। তিনি বলেন, “হামলার শিকার হলে ইসরাইলের পাল্টা আক্রমণ করা উচিত।” ট্রাম্প আরও সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের ঘটনা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
গাজা ও ইসরাইলের মধ্যকার এই সাম্প্রতিক সংঘাত আন্তর্জাতিক মহলকে উদ্বিগ্ন করেছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ইতিমধ্যেই সংঘাত নিয়ন্ত্রণ এবং সহিংসতা রোধের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অস্ত্রবিরতি চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া কঠিন।
ইসরাইলি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিমান হামলার পাশাপাশি তাদের স্থলসৈন্যও কার্যক্রম চালাচ্ছে। একাধিক এলাকায় কামানের গোলাবর্ষণ, বিমান ও ড্রোন হামলার মধ্যে অন্তত ৫০টি অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে। প্রতিপক্ষ ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীও ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ফলে তেলআবিব ও গাজা অঞ্চলের সীমান্তে নাগরিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গাজা অঞ্চলে চলমান এই ধরনের হামলার পেছনে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং কৌশলগত কারণে সংঘাত জটিল হয়ে পড়ছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী গাজা স্ট্রিপের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সতর্ক করেছে, শিশু ও মহিলাদের উপর হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে। শরণার্থী শিবির, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় এই সতর্কবার্তা আরও গুরুত্ব পেয়েছে। গাজার স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর চাপ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মেডিকেল কমপ্লেক্সগুলো প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানেও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
গাজা স্ট্রিপে চলমান সংঘাতের ফলে খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো জানিয়েছেন, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সেবা প্রদানে সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও জটিল রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কাড়ে যে, গাজার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
গাজার এই সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর উভয় পক্ষকে শান্তি স্থাপনের আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যুদ্ধবিরতি ঘোষণা বা রাজনৈতিক সংলাপ নয়, বাস্তবিকভাবে নাগরিকদের নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সমঝোতা নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখযোগ্য যে, এই সংঘাতের মধ্যেই শিশুদের উপর হামলার খবর সবচেয়ে গভীর মানবিক উদ্বেগ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাংবাদিকরা জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে ফাঁসা পড়া শিশু ও নাগরিকদের উদ্ধার দ্রুত করতে হবে। তবে সেনা এবং নিরাপত্তার কারণে উদ্ধার কার্যক্রম সীমিত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজার শান্তি স্থাপনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং উভয় পক্ষের অন্তত কিছুটা সমঝোতা অপরিহার্য। অন্যথায়, নাগরিকদের ওপর হামলা, অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানুষের মৃত্যু ক্রমশ বাড়তে থাকবে।
গাজায় চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রধান শিরোনাম হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরিস্থিতি মনিটর করছেন। তিনি জাপান থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের বলেন, ইসরাইলের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে, তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ অপরিহার্য।
এই সংঘাতের মধ্যে ফিলিস্তিনি সাধারণ জনগণকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শিশু, নারী এবং বৃদ্ধদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ধ্বংসস্তূপ সরানো এবং আহতদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য তৎপর রয়েছে, তবে পরিস্থিতি এখনো সংকটাপন্ন।
গাজায় সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৎপরতা, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রভাব আগামী দিনের শান্তি ও নিরাপত্তার দিকে প্রভাব ফেলবে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একতাবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া গাজার মানুষ নিরাপদ থাকবে না।