খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় ফের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন পাহাড়ি সাধারণ মানুষ। স্থানীয় সূত্র, মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) জেলা শাখা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। তারা অভিযোগ করছে— ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) নামে পরিচিত একটি আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র কর্মীরা সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালিয়ে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করেছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে ইউপিডিএফের আধিপত্য বিস্তারের নামে সাধারণ জনগণের উপর দমননীতি চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক তিনটি হত্যাকাণ্ড তারই ধারাবাহিকতা। এ নিয়ে খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় দোকানপাট ও বাজারে ব্যবসায়ীরা দিনের বেলা দোকান খোলা রাখলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
পিসিসিপির নেতৃবৃন্দের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনের নিরব ভূমিকা এ ধরনের অপরাধকে উৎসাহিত করছে। তারা অবিলম্বে হত্যার বিচার ও পাহাড়ে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছে।
খাগড়াছড়ি সদর থানা পুলিশের এক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সম্প্রতি স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে ইউপিডিএফ ও প্রতিপক্ষ গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা থেকেই হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছে। তবে প্রশাসন বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বাহিনী মোতায়েন করে এলাকা টহল জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ ইতোমধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান ইউনুস সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা চাপে রয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ, অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট—এই দুই সঙ্কটের মাঝেই সরকার স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংগ্রাম করছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী দ্বন্দ্বের জায়গা এখন দখল করেছে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং সামাজিক মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণ।
অন্যদিকে, ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিষয়ে সমালোচনা উঠে এসেছে যে, তিনি সেনাবাহিনীর সহায়তায় আন্তর্জাতিকভাবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছেন। তবে সরকারি সূত্র এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রেখেই দেশ পরিচালনা করছে।
ইউনুস সরকারের প্রেস প্রধান শফিকুর রহমান বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বর্তমান সরকার দেশের অভ্যন্তরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। যারা দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তারা চক্রান্তকারীদের অংশ।” তিনি আরও দাবি করেন, “শেখ হাসিনার সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় দমননীতি ছিল, যা আজ ইতিহাসের অংশ। এখন দেশ গণতন্ত্রের পথে ফিরেছে।”
তবে, দেশের আইনজীবী মহলের একাংশ বলছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া ও রায় প্রদানের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। লন্ডন-ভিত্তিক একটি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার বক্তব্যে বলা হয়, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রতিহিংসার সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান। এটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা।”
এদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, তার বিরুদ্ধে রায়ের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সত্য নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর অংশ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ এখন এক জটিল রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরের শুরুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এর আগেই সহিংসতা ও পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে দেশ এখন কঠিন সময় পার করছে। টাকার অবমূল্যায়ন, রিজার্ভ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থাহীনতা সরকারের ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় পাহাড়ি অঞ্চলের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ইমেজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসান ফয়সাল বলেন, “বাংলাদেশ এখন অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত দুই ধরনের চাপের মুখে। পাহাড়ি এলাকায় সংঘাত এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যদি নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোও পাহাড়ে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, প্রতিবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা সাধারণ জনগণের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের একাংশ মনে করছে, ক্ষমতার লড়াই এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝে সাধারণ মানুষই সবসময় বলির পাঁঠা হয়ে থাকে। পাহাড়ের মানুষ আজও সেই পুরনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে— শান্তি চুক্তি কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে স্থায়ী শান্তি আসবে পার্বত্য চট্টগ্রামে