ওপেনএআই-এর নতুন দৌড়: ‘অ্যাটলাস’ কি গুগল ক্রোমের যুগের অবসান ঘটাবে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৭ বার

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্ব প্রযুক্তি জগতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ওয়েব ব্রাউজার। ওপেনএআই সম্প্রতি উন্মোচন করেছে তাদের নতুন প্রজন্মের ওয়েব ব্রাউজার ‘অ্যাটলাস’, যা অনেকের মতে গুগল ক্রোমের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্রাউজারগুলোর জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করছে।

ওপেনএআই, যাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, এবার সরাসরি ইন্টারনেট ব্রাউজিং জগতে প্রবেশ করছে এক নতুন কৌশল নিয়ে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পদক্ষেপ শুধু ওয়েব ব্রাউজার বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং এটি এআই প্রযুক্তিকে দৈনন্দিন অনলাইন জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার এক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা।

অ্যাটলাসের মাধ্যমে ওপেনএআই তাদের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারকারী বেস থেকে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে চায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান চলতি মাসের শুরুতে জানান, বর্তমানে চ্যাটজিপিটির সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারী সংখ্যা ৮০০ মিলিয়নে পৌঁছেছে, যা গত ফেব্রুয়ারিতে ছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন। এই দ্রুত বৃদ্ধিই কোম্পানিকে নতুন পণ্য ও সেবা চালু করতে উৎসাহিত করেছে, যার বাস্তব ফল ‘অ্যাটলাস’।

অ্যাটলাসকে প্রচলিত ওয়েব ব্রাউজারের থেকে আলাদা করেছে এর মূল দর্শন— এটি শুধু একটি ব্রাউজার নয়, বরং ব্যবহারকারীর জন্য এক ডিজিটাল সহকারী। ব্রাউজারের প্রচলিত অ্যাড্রেস বারটি এখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছে চ্যাটজিপিটির কথোপকথনভিত্তিক ইন্টারফেস দিয়ে। ফলে ব্যবহারকারী সার্চ বারে কিওয়ার্ড না লিখে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারেন, আর অ্যাটলাস তার জন্য ওয়েব থেকে উত্তর বের করে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করে।

স্যাম অল্টম্যানের ভাষায়, “আমরা চাই মানুষ ব্রাউজিংয়ের সময় আরেকটু স্মার্ট, আরও মানবিক অভিজ্ঞতা পাক। অ্যাটলাস সেই লক্ষ্যেই তৈরি।”

অ্যাটলাসের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো— এটি ওয়েব ব্রাউজিংকে এআইয়ের সঙ্গে একীভূত করেছে। ব্যবহারকারী যে কোনো ওয়েবসাইটে থাকাকালীন চ্যাটজিপিটির সাইডবার খুলে তথ্য সংক্ষিপ্ত করতে, তুলনা করতে বা বিশ্লেষণ করতে পারেন। যেমন কোনো পণ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাটলাস পণ্যের বৈশিষ্ট্য, দাম এবং বিকল্প তুলনা করে সংক্ষেপে জানাবে।

এই ব্রাউজারে একটি “এজেন্ট মোড” চালুর সুযোগও থাকবে, যা অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করা যাবে। এজেন্ট মোড সক্রিয় থাকলে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীর হয়ে ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করতে, তথ্য পাঠাতে বা এমনকি অনলাইনে কেনাকাটাও সম্পন্ন করতে পারবে। সম্প্রতি এক প্রদর্শনীতে ওপেনএআইয়ের ডেভেলপাররা দেখিয়েছেন, অ্যাটলাস ব্যবহার করে কীভাবে রান্নার একটি রেসিপি খুঁজে নিয়ে মার্কিন মুদি সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ইনস্টাকার্টের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা যায়।

এছাড়া, ওপেনএআই ইতিমধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক ই-কমার্স ও ভ্রমণসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, অ্যাটলাসের সঙ্গে এটসি, শপিফাই, এক্সপেডিয়া এবং বুকিং ডটকমের মতো প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সরাসরি চ্যাটজিপিটির মধ্য থেকেই পণ্য কেনা বা ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে পারেন।

কিংস কলেজ লন্ডনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইনস্টিটিউটের প্রধান অধ্যাপক এলেনা সিমপার্ল অ্যাটলাস সম্পর্কে বলেন, “অ্যাটলাস অন্য যেকোনো ব্রাউজারের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ ব্যবহারকারীকে বিভিন্ন লিংকে যেতে হবে না— ব্রাউজার নিজেই প্রাসঙ্গিক তথ্যের সারাংশ উপস্থাপন করবে।”

তবে তিনি সতর্ক করে দেন, “যেসব সংক্ষিপ্তসার অ্যাটলাস তৈরি করবে, তার নির্ভুলতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। নতুন ধরনের এআই ব্রাউজার এখনও নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য তথ্যের পার্থক্য পুরোপুরি করতে সক্ষম নয়।”

ওপেনএআই অবশ্য জানিয়েছে, অ্যাটলাসে উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে। কোম্পানির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “অ্যাটলাস ব্যবহারকারীর হয়ে কোড চালাতে, ফাইল ডাউনলোড করতে বা অন্য কোনো অ্যাপ খুলতে পারবে না। এটি ব্যাংক ও আর্থিক সেবার মতো সংবেদনশীল ওয়েবসাইটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যাবে।”

অ্যাটলাসে ‘ব্রাউজার মেমোরি’ নামে একটি বিশেষ ফিচারও যুক্ত করা হয়েছে। এটি ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং ইতিহাস মনে রাখে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ অনুসন্ধানের সময় সেই তথ্য কাজে লাগায়। তবে ওপেনএআই বলছে, এই ফিচার সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক, ব্যবহারকারী চাইলে মেমোরি বন্ধ রাখতে পারেন এবং তাদের ডেটা নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে তাদের হাতেই।

তবুও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অ্যাটলাস ডেটা গোপনীয়তার নতুন প্রশ্ন তুলেছে। অধ্যাপক সিমপার্ল বলেন, “আমরা যখন চ্যাটজিপিটিকে প্রম্পট দিই, তখন প্রায়ই ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করি। এখন সেটি একটি ওয়েব ব্রাউজারের অংশ হয়ে যাচ্ছে, যেখানে আমাদের ব্রাউজিং ইতিহাসও যুক্ত হচ্ছে। এটি একটি বড় গোপনীয়তা ঝুঁকি।”

তিনি আরও বলেন, “ওপেনএআই এখনো পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি যে তারা ব্যবহারকারীর তথ্য নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক। তাই এই নতুন ব্রাউজার ব্যবহার করার আগে সবারই সচেতন থাকা উচিত।”

ওপেনএআই অবশ্য স্বীকার করেছে যে অ্যাটলাসের ‘এজেন্ট ফিচার’-এ কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, ভুল বা ক্ষতিকর নির্দেশনা ওয়েবপেজ বা ইমেইলে লুকিয়ে থাকতে পারে, যা এজেন্ট মোডে চালু থাকলে অনিচ্ছাকৃতভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে বা ডেটা চুরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এই ধরনের দুর্বলতা শনাক্ত করতে তারা ব্যাপক পরীক্ষা চালাচ্ছে এবং যেকোনো নিরাপত্তা ত্রুটি পাওয়া গেলে তা দ্রুত সমাধান করা হবে।

ওপেনএআই ব্যবহারকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা নিজেদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সতর্ক থাকেন এবং কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধা ভালোভাবে বিবেচনা করেন।

প্রযুক্তি মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, অ্যাটলাস কি সত্যিই গুগল ক্রোমের মতো ব্রাউজারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে? ক্রোম বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত ব্রাউজার, যার মার্কেট শেয়ার প্রায় ৬০ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে সাফারি, এজ এবং ফায়ারফক্স। বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাটলাসের এআই-নির্ভর নকশা প্রযুক্তিগতভাবে বিপ্লব ঘটাতে পারে, তবে বাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে সময় লাগবে।

সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্রযুক্তি বিশ্লেষক রবার্ট মেয়ার্স বলেন, “গুগল ক্রোম শুধুমাত্র একটি ব্রাউজার নয়, এটি একটি ইকোসিস্টেম। ওপেনএআইকে এই ইকোসিস্টেমে ঢুকতে হলে তাদের শুধু প্রযুক্তিগতভাবে নয়, ব্যবহারকারীর আস্থা ও গোপনীয়তা রক্ষার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “অ্যাটলাস নিঃসন্দেহে এক চিত্তাকর্ষক প্রযুক্তি, কিন্তু এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী এক বছরেই বোঝা যাবে, এটি সত্যিই মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারবে কিনা।”

অন্যদিকে, কিছু প্রযুক্তি সাংবাদিক মনে করছেন, অ্যাটলাস গুগলের জন্য একটি বাস্তব হুমকি নয় বরং এটি ওয়েব ব্রাউজারের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু সার্চের সহায়ক নয়, বরং ব্রাউজিং অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে— এই পরিবর্তনের পথিকৃৎ হিসেবেই দেখা হচ্ছে ওপেনএআইয়ের এই নতুন প্রকল্পটিকে।

সর্বোপরি বলা যায়, অ্যাটলাস শুধুমাত্র একটি ব্রাউজার নয়, এটি মানুষ ও মেশিনের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়। তবে এটি কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা, নির্ভুলতা এবং ব্যবহারকারীর আস্থার উপর। প্রযুক্তির ইতিহাস বলে— প্রতিটি নতুন উদ্ভাবন প্রথমে প্রশ্ন তোলে, পরে উত্তর দেয়। অ্যাটলাস এখন সেই প্রশ্নের পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর সময়ই বলে দেবে, এটি গুগল ক্রোমের যুগে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারবে কিনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত