সোয়া কোটি টাকার অবৈধ কাঠ উদ্ধার, ইউপিডিএফ সদস্যদের পলায়ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪১ বার

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলার বার্মাছড়িমুখ বাজার দেওয়ানপাড়া এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় সোয়া কোটি টাকার অবৈধ কাঠ। বুধবার বিকেলের এই অভিযানে সেনাবাহিনী বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা প্রায় চার হাজার ঘনফুট কাঠ উদ্ধার করে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য এক কোটি বিশ লাখ টাকা। কাঠগুলো নদীপথে বাঁশের চালির উপর বিশেষভাবে সাজিয়ে সমতল এলাকায় পাচারের প্রস্তুতি চলছিল বলে জানা গেছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা টহলকালে কাঠ বহনের এ অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে সন্দেহ হলে অভিযান চালায়। সেনা টহলের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা দ্রুত কাঠ ও বাঁশের চালি ফেলে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত কাঠ পরবর্তীতে বন বিভাগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের কাঠ পাচারের ঘটনার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

লক্ষীছড়ি জোনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম জানান, তাদের ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে। তিনি বলেন, “আমরা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিরোধে সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”

অভিযান-পরবর্তী একাধিক সূত্র জানায়, বার্মাছড়িমুখ বাজারসংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কাঠ পাচারের একটি গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল। স্থানীয় বনভূমি থেকে অবৈধভাবে সংগৃহীত কাঠ নদীপথে বাঁশের চালিতে বেঁধে সমতল এলাকায় এনে বিক্রি করা হতো। এই কাঠের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন শহরে পাঠানো হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি ও অভিযানের ফলে এ চক্রটি চাপে পড়ে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

খাগড়াছড়ির দুর্গম বার্মাছড়িমুখ এলাকায় সম্প্রতি সেনাবাহিনী একটি বেইজ পেট্রোল ক্যাম্প স্থাপন করেছে, যার ফলে পাহাড়ি অঞ্চলের নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও জোরদার হয়। এ পদক্ষেপের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে নানা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন মনে করছে, এই প্রচারণার মাধ্যমে তারা তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত কাঠের পরিমাণ ও গুণগত মান পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, এটি উচ্চমূল্যের বনজ প্রজাতির কাঠ, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সম্ভবত সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাটা হয়েছে। স্থানীয় বন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এই পরিমাণ কাঠ কাটা ও পরিবহনের পেছনে অবশ্যই একটি বড় সংগঠনের সহায়তা আছে। নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার না করলে এমন ঘটনা রোধ করা কঠিন।”

এলাকার বাসিন্দারা জানান, ইউপিডিএফের কিছু সদস্য স্থানীয় বনজ সম্পদ থেকে কাঠ সংগ্রহ করে পাচার করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। পাচারের এই আয় থেকে সংগঠনের অবৈধ কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় ভুক্তভোগী গ্রামবাসী এসব ঘটনার প্রতিবাদ করলেও ভয়ভীতি ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।

এদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে কাঠ পাচারের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে তারা মনে করেন, এই চক্র পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বেশ কয়েকজন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি মনে করছেন, ইউপিডিএফের অর্থনৈতিক শক্তির মূল উৎসই হলো এমন অবৈধ কাঠ বাণিজ্য ও পাচার। তাই এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দিলে সংগঠনের আর্থিক প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগবে। তারা আরও বলেন, “পাহাড়ের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে অবৈধ কাঠ ব্যবসার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা দরকার।”

লক্ষীছড়ি ও আশপাশের এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়তি টহল জারি রয়েছে। এলাকাজুড়ে সেনা সদস্যদের উপস্থিতি স্থানীয়দের মাঝে নিরাপত্তাবোধ জাগালেও পাচারচক্রের সদস্যরা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত ও আটক করতে তদন্ত চলছে, এবং ভবিষ্যতে আরও বড় অভিযান হতে পারে।

অভিযানটি পাহাড়ি অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক সাফল্যের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, এই ধারা বজায় থাকলে শুধু অবৈধ কাঠ পাচার নয়, বরং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোরও সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত