চালের বাজারে সিন্ডিকেটের প্রচেষ্টা -নতুন অস্থিরতার পাঁয়তারা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
চালের বাজারে সিন্ডিকেটের প্রচেষ্টা -নতুন অস্থিরতার পাঁয়তারা

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশের চালের বাজারে আবারও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা শুরু হয়েছে। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও করপোরেট কোম্পানিগুলো মুনাফার স্বার্থে ‘চাল আমদানি বন্ধের গুজব’ ছড়িয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। সরকার ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েও এই গুজবের প্রভাবে বাজারে ইতিমধ্যে কিছুটা কৃত্রিম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত, মিয়ানমার ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক চাল আমদানির ফলে দেশে সরবরাহ বেড়ে গেছে। এই বাড়তি সরবরাহের কারণে গত দুই মাসে সব ধরনের চালের দাম কমেছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এ স্থিতিশীল পরিস্থিতি করপোরেট হাউসগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী হওয়ায় তারা নানা উপায়ে গুজব ছড়িয়ে দাম বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।

রাজধানীর চাঁদপুর রাইস এজেন্সির ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া বলেন, “যদি করপোরেট কোম্পানিগুলোর সততা থাকত, তবে চালের দাম আরও কমতে পারত। কিন্তু তারা গুজব ছড়িয়ে মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আবার বলা হচ্ছে, সরকার নাকি আমদানি বন্ধ করতে যাচ্ছে— অথচ বাস্তবে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।”

অন্যদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, চাল আমদানি বন্ধের কোনো আলোচনা সরকারের কোথাও হয়নি। বরং মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রয়োজনে চাল আমদানি অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, “সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় এখন নিয়মিত চাল বাজারে প্রবেশ করছে। এতে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং সিন্ডিকেটের সুযোগ কমেছে।”

সরকারি তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ৩ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং সরকারি পর্যায়ে ৫০ হাজার ৪৩০ টন চাল আমদানি করা হয়েছে। এ বছর সরকার মোট ৯ লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি প্রায় ১১ লাখ টন গমও আমদানি করা হয়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর আরও এক লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ৫০ হাজার টন আতপ চাল এবং দুবাই থেকে ৫০ হাজার টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল আমদানি করা হবে। আন্তর্জাতিক দরপত্র এবং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে এই আমদানি সম্পন্ন হবে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৪৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

চলতি বছর দেশে বোরো মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হলেও গত জুন মাস থেকে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মোটা, মাঝারি ও সরু চালের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছিল ৮ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। আগস্টের শেষে এসে দাম স্থিতিশীল হতে শুরু করলেও অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে আবার দাম কমার প্রবণতা দেখা যায়। গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজিতে পাঁচ থেকে ছয় টাকা এবং বস্তাপ্রতি ১২৫ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর পেছনে প্রধান কারণ হলো সরকারি আমদানি ও মজুতের প্রভাব।

রাজধানীর বাবুবাজার, নয়াবাজার এবং কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে বাজারে চালের সরবরাহ বেড়েছে। ইরি ও স্বর্ণা জাতের মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫২ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। আটাশ, পাইজাম জাতের মাঝারি চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়; আগে এই চালের দাম ছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা পর্যন্ত। নাজিরশাইল জাতের সরু চালের দামও সাত টাকা পর্যন্ত কমেছে। ভালো মানের নাজিরশাইল এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, নিম্নমানেরগুলো ৭২ থেকে ৭৫ টাকায়।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী হাজী আবু ওসমান বলেন, “বাজারে এখন সরবরাহ ভালো। আমদানি অব্যাহত থাকলে আমন মৌসুমে দাম আরও কমবে। আগে মিল মালিকরা দাম নিয়ন্ত্রণ করত, এখন সেই সুযোগ আর নেই। সিন্ডিকেট ভাঙছে, আর এ কারণেই তারা আবার গুজব ছড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে।”

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে প্রায় তিন লাখ ৭৬ হাজার টন ধান ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া ৪৯ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল ১৪ হাজার টন এবং ৪৮ টাকা কেজি দরে আতপ চাল ৫১ হাজার টন কেনা হয়েছে। বর্তমানে সরকারের খাদ্যভাণ্ডারে মজুত রয়েছে ১৪ লাখ এক হাজার ৪৪৬ টন চাল এবং দুই হাজার ৫৬৬ টন ধান। এই পর্যাপ্ত মজুত বাজারকে স্থিতিশীল রাখার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চালের দাম কিছুটা কমায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আগস্ট মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান ছিল ৪৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা নেমে এসেছে ৪৫ শতাংশে। সেপ্টেম্বরে গড়ে চালের দাম প্রায় এক শতাংশ কমেছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম নিম্নমুখী, সরকারও নিয়ন্ত্রিতভাবে আমদানি করছে। এতে দেশে দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছে। এখন করপোরেট হাউসগুলো আবার গুজব ছড়িয়ে মুনাফা করার চেষ্টা করছে। সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আবারও বিপাকে পড়বে।”

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবারের বাজেটে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল ক্রয়ের জন্য ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং বিদেশ থেকে আমদানির জন্য ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রয়োজনে এই বরাদ্দ বাড়ানো বা কমানো যেতে পারে। তার মতে, বাজারে পর্যাপ্ত চাল সরবরাহ ও মজুত থাকায় চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বাজারে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে নজরদারি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। খাদ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে এবং কোনো ব্যবসায়ী মজুতদারি বা গুজব ছড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশে এখন চালের সরবরাহ স্বাভাবিক, এমনকি অতিরিক্তও বলা যায়। কিন্তু কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা থামানো না গেলে সাময়িক স্থিতিশীলতাও টিকবে না। সরকারের স্বচ্ছ বাজারনীতি ও নিয়মিত আমদানিই এখন বাজারে ভারসাম্য রাখার মূল চাবিকাঠি।

চালের বাজার নিয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা মূলত গুজব নির্ভর ও সিন্ডিকেট-নির্ভর। সাধারণ মানুষের স্বার্থে সরকারের উচিত দ্রুত তথ্য-উন্মুক্ত উদ্যোগ নেওয়া, যাতে মানুষ সত্য ও গুজবের পার্থক্য বুঝতে পারে। কারণ চাল শুধু একটি পণ্য নয়— এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল উপাদান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত