১০. গণভোটের দাবিতে নতুন জোট রাজনীতির ইঙ্গিত, ইসিতে সরব জামায়াত ও মিত্ররা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭১ বার
জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না জামায়াতের ৫ শীর্ষ নেতা

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

নভেম্বরের মধ্যে সাধারণ গণভোট আয়োজনের দাবি নিয়ে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও সমমনা আরও ছয়টি দল বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিকট পৃথক পৃথক স্মারকলিপি উপস্থাপন করেছে। আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের বাইরে সকাল থেকে দলগুলোর নেতাকর্মীরা সমবেত হয়ে সংক্ষিপ্ত সভা করেছেন এবং পরে শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে প্রতিটি দলের প্রতিনিধি কমিশনে প্রবেশ করে তাদের লিখিত দাবিপত্র হস্তান্তর করেন। দলগুলোর বক্তব্য, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নসহ নির্ধারিত কিছু পরিবর্তন ও নিশ্চয়তা না দিলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে গণভোট আয়োজন না হলে তা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

দলগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান আন্দোলনকে তারা আরও জোরদার করতে চায় এবং এ লক্ষ্য সফল করতে পাঁচ দফা দাবির বাস্তবায়ন জরুরি। নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া স্মারকলিপিতে তাদের মূল দাবি ছিল—জাতীয় নির্বাচনবার্ষিকতায় সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু করা, সবার জন্য নির্বাচনী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, সরকারি নির্যাতন ও দুর্নীতির বিচারের দৃশ্যমানতা, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কর্মসূচি নির্বিশেষে যে কোনো স্বৈরাচারী কার্যকলাপ বারণ এবং ‘‘জুলাই সনদ’’-এর দ্রুত বাস্তবায়ন। স্মারকলিপি দেয়ার আবেদন কার্যক্রমে দলের নেতারা বলেছেন, এই পরিবর্তনগুলো ছাড়া ভবিষ্যৎ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তাই দ্রুত গণভোটের ঘোষণা সহ দাবি বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

এ দিন অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমদ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। উপস্থিত অন্য নেতারা স্বতন্ত্রভাবে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং নির্বাচন কমিশনকে সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাদের দাবির বিশদ ব্যাখ্যা সরবরাহের অনুরোধ জানান। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার আবারো সতর্ক করে বলেন যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে থাকা ঐকমত্য কমিশন রাজনীতিতে যে অসংগতির সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করার জন্য দায়িত্ব নিতে পারে। তিনি দাবি করেন, ‘‘অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং নভেম্বরে গণভোটের ঘোষণা দেয়া হোক।’’

রোববারের ওই কর্মসূচিতে অংশ নেয়া গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষনেতার তালিকায় খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও ডেভেলপমেন্ট পার্টি-সহ মোট আটটি দল রয়েছে, যারা একযোগে পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের পক্ষে জোরালোভাবে অবস্থান ব্যক্ত করেছে। তারা দাবি করেছে, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সুযোগ-অসীমতা ও ক্ষমতার একতরফা ব্যবহার দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষুন্ন করেছে এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, প্রগতিশীল ও সংরক্ষণশীল বিভিন্ন শানিত রাজনৈতিক দলের একযোগে বিদ্যমান উদ্বেগ প্রকাশ করা এবং দ্রুত গণভোটের দাবি তুললে তা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে তাত্পর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের ভাষ্য, যদি এই ধরনের দাবি বিস্তৃতভাবে সমর্থিত হয় এবং বড় অংশীদারিত্ব লাভ করে, তবে তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংলাপ ও নির্বাচনী সংস্কৃতিকে পুনরায় নির্ধারণের পথে প্রেরণা যোগাবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, কোনো সংবিধানিক বা আইনগত কাঠামো ছাড়া গণভোট ঘোষণা কিংবা সেটিকে বাস্তবায়নের দাবিতে চাপ প্রয়োগ করলে তা দেশের সংবিধানিক স্থিতিশীলতায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, গণভোট কিংবা নির্বাচনী অবকাঠামো পরিবর্তন জরুরি হলে তা সংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই করা উচিত। তারা যুক্তি দেন, সংলাপ ও জাতীয় পর্যায়ের সমঝোতা ছাড়া কোনো রূপায়ণ দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। বিশেষত পিআর পদ্ধতি ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়গুলি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, আইনগত প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা সবই সমানভাবে জরুরি।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন পক্ষ ও নির্বাচন কমিশন যদি এই দাবিগুলোকে অগ্রাহ্য করে বা সমাধানের দাবিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে, তাহলে আন্দোলন তীব্র হতে পারে এবং সেটি সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে প্রভূত বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে; সেই বিভাজন আরও বৃদ্ধি পেলে নাগরিকদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। ফলে সরকার, কমিশন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমঝোতা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।

সমাজকর্মী ও মানবাধিকারের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, যে কোনো নির্বাচনী সংস্কারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের বিষয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে। তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলাকালে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সক্রিয় নজরদারি চালাতে হবে যাতে অহেতুক নিপীড়ন বা নির্যাতনের ঘটনা রোধ করা যায়। পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ও সহায়তা নেয়া যেতে পারে—তবে সেটি নীতিগতভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ হওয়া উচিত।

দলগুলোর ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর একটি শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যাতে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা তাদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন আরও সংগঠিত করে তোলার কৌশল নির্ধারণ করবেন এবং প্রয়োজনে দেশব্যাপী কর্মসূচি পরিচালনার রূপরেখা প্রণয়ন করবেন। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত ইতিহাসে কেমন প্রভাব ফেলে তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে।

ফলে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নির্ধারণে এই দাবিদাওয়া ও স্মারকলিপি উপস্থাপনের ঘটনা এক ধাপে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি কোনো একক দলের দাবি নয়—বরং একাধিক গোষ্ঠী সমন্বয়ে যে চেতনা প্রকাশ পাচ্ছে তা দেশের রাজনৈতিক সংলাপ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আবারও গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে যে, যে কোনো উপায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সময়োপযোগী সংলাপ ও যথাযথ প্রতিষ্ঠানগত সমাধান খুঁজে বের করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পথ।

নাগরিক জীবনের স্বার্থে এবং দেশের সংবিধানিক ও সংস্থাগত স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রত্যাশা, যে দাবি-আদায়ে এগোনো হয়েছে সেটি যেন সংবিধান ও আইনের আলোকে বিবেচিত হয় এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত জনমত ও সামাজিক সংহতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে নেয়া হয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকেই এখন সংলাপ-ভিত্তিকভাবে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দায়িত্বশীল মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত