প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে উপকূল সংরক্ষণের জন্য নির্মাণাধীন ৫০০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্পে অনিয়ম এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, প্রকল্পের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালি ও পাথরের মান যথাযথ নয়, যা পুরো বেড়িবাঁধ প্রকল্পকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সরেজমিনে উপজেলার ছনুয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সিসি ব্লক তৈরিতে মানসম্মত সিলেটি বালির পরিবর্তে স্থানীয় বেতাগী বালি এবং ময়লাযুক্ত পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, সাগরের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে বালু আনলোড করা হচ্ছে এবং সেই বালুই ব্যবহার করা হচ্ছে বেড়িবাঁধের কাজের জন্য। দিনের আলোয় প্রশাসনের নজর এড়াতে রাতের বেলা এই বালু আনলোড করা হচ্ছে। এতে আশেপাশের কৃষিজমি ও মাছের ঘের লবণাক্ত পানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আগেও বেড়িবাঁধ নির্মাণে চুরি ও নিম্নমানের কাজ হয়েছে, এখন আরও ভয়াবহভাবে অনিয়ম চলছে। রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ঠিকাদাররা সরকারি টাকা লুট করছে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া, খানখানাবাদ ও বাহারছড়া উপকূল রক্ষায় ৫০৪ কোটি টাকার এই বেড়িবাঁধ প্রকল্প গত ২৮ মে একনেকে অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় ৬.৪ কিলোমিটার সমুদ্র উপকূলীয় বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ভাঙন রোধ ও পুনর্গঠন কাজের পাশাপাশি ১.১ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ছনুয়ার ২.৮ কিলোমিটার অংশের কাজ করছে প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল)। এছাড়া খানখানাবাদ-কদমরসুল পয়েন্টে যৌথভাবে কাজ করছে পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং। দুটি পয়েন্টে মোট নয়টি প্যাকেজে ২৪৭ কোটি টাকার কাজ চলছে।
স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ২০১৫ সালে ৩০০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্পেও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছিল। সেই প্রকল্পের বাঁধ ২০২৩ সালে সাগরে তলিয়ে যায়। সম্প্রতি প্রেমাশিয়া এলাকায় আরও দুইশ’ মিটার বাঁধ ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের প্রকল্পে দুর্নীতি করা প্রতিষ্ঠান ‘হাসান ব্রাদার্স’কে পুনরায় নতুন প্রকল্পে কাজ দেওয়া হয়েছে, যা দুর্নীতির আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন খানখানাবাদ বেড়িবাঁধ প্রকল্প এলাকায় সম্প্রতি অভিযান চালায়। এই সময় দুটি বলগেট ও একটি ড্রেজার জব্দ করা হয় এবং নির্মাণকাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আকন জানান, “লবণাক্ত পানি দিয়ে বালি আনলোডের অভিযোগে পিডিএলকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও পাউবো কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।”
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএলের প্রজেক্ট ম্যানেজার সাদিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, “আমরা ওই বালু গ্রহণ করি নি। স্থানীয় কিছু মানুষ জোরপূর্বক বালু আনলোড করেছে। নতুন করে নলকূপ বসিয়ে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।” অন্যদিকে, পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ বলেন, “লবণাক্ত পানি দিয়ে বালি আনলোডের বিষয়টি জানার পর কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এখন গভীর নলকূপের মাধ্যমে মিষ্টি পানি ব্যবহার করা হবে।” তবে তিনি নিম্নমানের বালি ও পাথর ব্যবহারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
স্থানীয়রা সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, “উপকূল রক্ষার এই প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে কয়েক বছরের মধ্যে এই বাঁধও সাগরে বিলীন হয়ে যাবে।” তারা আশঙ্কা করছেন, প্রশাসনের অনীহা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রকল্পের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে।
উল্লেখ্য, বাঁশখালী এলাকার এই বেড়িবাঁধ কেবল স্থানীয় কৃষি ও মৎসজীবীদের জীবন রক্ষা করেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি চট্টগ্রাম জেলার উপকূলীয় এলাকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে নির্মাণ না হলে বৃষ্টিপাত ও সুনামি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা জানিয়েছে, সরকারের তদারকি ও কড়াকড়ি ছাড়া এই প্রকল্প সফল হবে না। প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন না হলে স্থানীয় কৃষি জমি, মাছের ঘের ও বসতি এলাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।