জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক: মির্জা ফখরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
মির্জা ফখরুলের সঙ্গে আইআরআই প্রতিনিধি দলের বৈঠক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে নেই।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত দলটির স্থায়ী কমিটির সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়গুলো কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ নামে একটি আদেশ জারি করার পরিকল্পনা করছে। সংযুক্তি-২ ও সংযুক্তি-৩ এই আদেশের খসড়া হিসেবে সংযুক্ত রয়েছে। তবে সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘আদেশ’ আইনের মর্যাদাপ্রাপ্ত। অতএব এটি জারি করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির অধীনে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নেই।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব ও সুপারিশ একপেশে। সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত, ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার ফলাফল অর্থহীন হয়েছে। এটি সম্পূর্ণভাবে অর্থ ও সময়ের অপচয় এবং জাতির সঙ্গে প্রতারণার সমতুল্য।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। সুতরাং সংলাপের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কিন্তু ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকারকে বিবেচনায় নেয়নি। সুপারিশে বলা হয়েছে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যরাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দায়িত্ব পালন করবে। এতে তারা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নেবেন। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দায়িত্ব নয়। সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি আলোচনায় উপস্থাপনও হয়নি। ফলে নির্বাচনের আগে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।”

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের আগে প্রস্তাবিত গণভোট আয়োজন সম্ভব নয়। সময়সঙ্কট, নির্বাচনের জন্য ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ব্যাপক লোকবল নিয়োগ বিবেচনায় এই গণভোট অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক। একই আয়োজনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়াই যুক্তিসঙ্গত।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রস্তাবিত আদেশে সংবিধান সংশোধনের জন্য অনুমোদিত গণভোট যদি অনুষ্ঠিত হয়, তাও পরবর্তী জাতীয় সংসদ ও নির্বাচিত সংবিধান সংস্কার পরিষদে নিশ্চিত হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে এটি কার্যকর করা সুষ্ঠু ও সংবিধানসম্মত নয়।”

তিনি আরও বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সুপারিশের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠনের বিষয়টি আলোচনা হয়নি। ফলে এটি সুপারিশের বাইরে। সংবিধান সংস্কারের উদ্দেশ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনকে অবিবেচনাপ্রসূত বলা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব নয়।”

বিএনপির মহাসচিব বলেন, “দেশের নাগরিকদের সামনে নির্বাচনের আগে গণভোটের নামে অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা জনস্বার্থের ক্ষতি। সংবিধান ও সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে সময়, আইনগত অধিকার এবং রাজনৈতিক সংলাপ মেনে চলা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজন করা যুক্তিসঙ্গত ও কার্যকর।”

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জোর দেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ একপেশে এবং জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘ সময়ের আলোচনার ফলাফল নস্যাৎ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। এ ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রার্থীদের জন্য স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক।”

মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের আলোকে দেখা যায়, বিএনপি মনে করছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত গণভোট আয়োজনের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এছাড়া সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে যথাযথ রাজনৈতিক সংলাপ ও মতামতের সুযোগ ছাড়াই সুপারিশ জারি করা হয়েছে। এটি জনগণের অধিকার এবং সংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে যে আদেশ জারি করতে চায় তা সংবিধান অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারের বাইরে। এটি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। অন্যভাবে বললে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের কোনো আইনগত ও সংবিধানগত বৈধতা নেই।”

মির্জা ফখরুল আরও যুক্তি দেখান, “গণভোট আয়োজনের আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়োগ, নির্বাচনী কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা বজায় রাখা কঠিন। এটি বিপুল ব্যয়, সময়সীমার চাপ এবং প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি করে। তাই জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠান অযৌক্তিক, অপ্রয়োজনীয় এবং অবিবেচনাপ্রসূত।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দল সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নেবে এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ ও সরকারের প্রস্তাবিত আদেশ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

মির্জা ফখরুলের এই অবস্থান দেশের রাজনীতিতে সংবিধান সংশোধন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বারবার জোর দিয়েছেন যে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও নাগরিক অধিকারকে সমুন্নত রাখা জরুরি এবং নির্বাচনের আগে অযাচিত গণভোটের আয়োজন জনগণের স্বার্থের বিপরীত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত