চাকরিতে নারীর কর্মঘন্টা কমানো নাকি নারীর সুজুগ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রসারণ সমীচীন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৬ বার
চাকরিতে নারীর কর্মঘন্টা কমানো নাকি নারীর সুজুগ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রসারণ সমীচীন

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কর্মঘণ্টা কমানো নারীর প্রতি সুবিধা নয় বরং এটি অনেক সময় নারীর কর্মজীবনকে দুর্বল করে ফেলে। কারণ, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে নারীর কাজের সময় সীমিত করা হয়, তখন সেটি অনেক নিয়োগকর্তার কাছে নারীর ‘কম সক্ষমতা’ হিসেবে ধরা হয়। ফলে, নিয়োগের সময় নারী প্রার্থীদের উপেক্ষা করার প্রবণতা দেখা দেয়। এর ফলে চাকরির বাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমে যায়, যা অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে।

অন্যদিকে, যারা পূর্ণ সময়ের চাকরিতে যুক্ত, তাদের অনেকেই কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে মানসিক ও শারীরিক চাপে ভোগেন। বিশেষত, শিশু পরিচর্যার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় কর্মজীবী মায়েদের জন্য অফিসে নিয়মিত উপস্থিত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে অনেক নারী চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এর ফলে, অর্থনীতিতে যে শ্রমশক্তির ক্ষতি হয়, তা পূরণ করা সহজ নয়।

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারী শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শুধু তাদের উৎপাদনশীলতাই বাড়ে না, বরং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে নারী-বান্ধব নীতি—যেমন শিশুসেবা কেন্দ্র, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সমান বেতন—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের অবস্থান বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান হলেও, মধ্য ও উচ্চস্তরের কর্পোরেট চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রেই নারী কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েন। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, অনিরাপদ যাতায়াত, মাতৃত্বকালীন ছুটির সীমাবদ্ধতা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নে বাধা—এসব কারণেই নারীরা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছেন।

‘তবে সরকার ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই এই বাস্তবতা পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নারী-বান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরির বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একইভাবে, কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও নারী কর্মীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক আওয়ার ও হোম অফিসের সুযোগ তৈরি করেছে।’

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে নারীর শ্রমকে সমান গুরুত্ব দিতে না পারলে উন্নয়নের স্থায়িত্ব অর্জন সম্ভব নয়। অর্থনীতির চাকা কেবল তখনই গতিশীল হবে, যখন পুরুষ ও নারী উভয়েই সমানভাবে শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে অবদান রাখতে পারবেন। কাজের ক্ষেত্রে নারীকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রাখার অর্থই হলো, দেশের সম্ভাবনাকে সীমিত করে ফেলা।

একজন কর্মজীবী নারী যখন প্রতিদিন পরিবারের দায়িত্ব সামলে অফিসে সময় দেন, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের নয়, দেশের অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারলে সমাজ তার প্রকৃত সামর্থ্যের অর্ধেকই হারাবে।

কর্মক্ষেত্রে নারী-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সবচেয়ে আগে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। নারীর কাজকে ‘সহায়ক ভূমিকা’ নয় বরং ‘অর্থনৈতিক অবদান’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি নীতিতে নারী কর্মীদের জন্য ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, পদোন্নতি ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা আরও সুসংহত করতে হবে।

আজকের বাংলাদেশে নারীরা শুধু পরিবার নয়, দেশের অর্থনীতিরও অপরিহার্য অংশীদার। তাই কর্মক্ষেত্রে নারীকে প্রতিযোগিতার বাইরে রেখে সমৃদ্ধির কথা বলা কেবল আত্মপ্রবঞ্চনা। কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করলেই কেবল প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। আর এই উন্নয়ন হবে সবার, যেখানে নারী ও পুরুষ সমানভাবে অবদান রাখবে দেশের অগ্রযাত্রায়।

বাংলাদেশের নারীরা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন—সুযোগ পেলে তাঁরা পিছিয়ে থাকেন না। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগগুলোকে আরও সম্প্রসারিত করা, যাতে প্রতিটি নারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারেন—তিনি শুধু পরিবার নয়, দেশের অর্থনীতিরও একজন সমান অংশীদার।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের এই গতিতে নারী শ্রমিকদের অবদান এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবুও দেশের কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত—একটি বাস্তবতা যা জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৩ শতাংশ নারী। ২০১০ সালে এই হার ছিল ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ গত এক দশকে নারী কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে পুরুষদের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশের ওপরে থেকে স্থিতিশীল রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও, নারীরা তার পেছনের অর্ধেক বলয়টিতে এখনো প্রান্তিক অবস্থানে।

তথ্য বলছে, শহরাঞ্চলে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ গ্রামাঞ্চলের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। কিন্তু বেশির ভাগ নারী এখনো কর্মরত তৈরি পোশাক, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে কর্মপরিবেশ, বেতন ও নিরাপত্তা নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুবিনা রহমান বলেন, “নারীর কর্মঘণ্টা কমানো বা তাদের ‘সহায়ক কর্মী’ হিসেবে দেখা আসলে এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য। এটি কর্মক্ষেত্রে নারীর দক্ষতা ও অবদানকে ছোট করে দেয় এবং শ্রমবাজারে তাদের প্রতিযোগিতার ক্ষমতাকে দুর্বল করে।”

বাংলাদেশে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান নারী কর্মীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। শিশুসেবা কেন্দ্রের অভাব, মাতৃত্বকালীন ছুটির সীমাবদ্ধতা, হয়রানির আশঙ্কা, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব—সব মিলিয়ে নারীরা তাদের কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েন। অনেক সময় এই চাপই তাদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জিডিপিতে নারী শ্রমের অবদান প্রায় ৩৬ শতাংশ। কিন্তু যদি নারীদের জন্য পূর্ণ সময়ের কর্মসংস্থান ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই অবদান ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে—যা দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হারকে ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ১০ শতাংশ বাড়ানো গেলে জাতীয় আয় বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, এখনো নারীরা কর্মক্ষেত্রে বেতন বৈষম্য, পদোন্নতিতে প্রতিবন্ধকতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুপস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

শ্রমনীতি বিশেষজ্ঞ মো. আখতারুজ্জামান বলেন, “নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ মানে শুধু তাদের চাকরিতে যুক্ত করা নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে তারা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। নারী শ্রমিকদের জন্য ডে-কেয়ার, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা ও সমান বেতন নিশ্চিত করা গেলে কর্মক্ষেত্রে স্থায়িত্ব এবং উৎপাদনশীলতা উভয়ই বাড়বে।”

সরকার সম্প্রতি নারী কর্মসংস্থানকে ত্বরান্বিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরকারি অফিসগুলোতে ধাপে ধাপে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি, বড় বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী কর্মীদের জন্য পৃথক বিশ্রামাগার ও স্যানিটারি সুবিধা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্পেও এখন অনেক কারখানায় শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র ও নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

অন্যদিকে, বেসরকারি খাতেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। আইটি, ব্যাংকিং এবং কর্পোরেট সেক্টরে অনেক কোম্পানি ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক আওয়ার, হাইব্রিড ওয়ার্কিং ও রিমোট অপশন চালু করেছে, যা নারী কর্মীদের জন্য কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হচ্ছে।

তবে চ্যালেঞ্জ এখনো অনেক। জাতীয় শ্রমনীতি ২০২৩ অনুসারে, নারী কর্মীদের জন্য ন্যূনতম ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হলেও, বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানই তা মানছে না। তাছাড়া, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন এখনো সন্তোষজনক নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, নারী শ্রমবাজারে টেকসই উন্নতি আনতে হলে শুধুমাত্র কর্মঘণ্টা নয়, বরং নারীর জন্য “কর্মসংস্কৃতি” বদলানো জরুরি। সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন করে নারীকে “সহযোগী শ্রমশক্তি” নয়, বরং “সমান অংশীদার” হিসেবে দেখতে হবে।

ঢাকার এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ফারজানা রহমান বলেন, “আমরা কাজ করতে চাই, কিন্তু অনেক সময় সুযোগটাই পাই না। কর্মক্ষেত্রে নারী হিসেবে নিরাপদ ও সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করা অনেক বড় সংগ্রাম। তবুও আমরা লড়ে যাচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নারী কর্মীদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সরকার, বেসরকারি খাত এবং সমাজ—সব অংশকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারী-বান্ধব কর্মনীতি, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, নিরাপদ যাতায়াত এবং সমান বেতন নিশ্চিত করা গেলে, নারীর অংশগ্রহণই হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান চালিকা শক্তি।

অর্থনীতির চাকা তখনই পূর্ণ শক্তিতে ঘুরবে, যখন নারীর শ্রম ও মেধা সমানভাবে মূল্যায়িত হবে। নারীকে কর্মজীবনে সমান সুযোগ দেওয়া মানে কেবল সামাজিক ন্যায় নয়, এটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত