সিলেটে বাড়ির পাশে সৌদি ফেরত যুবকের লাশ উদ্ধার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
সিলেটে বাড়ির পাশে সৌদি ফেরত যুবকের লাশ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেটের জালালাবাদ থানার হাটখোলা ইউনিয়নের এক প্রবাসফেরত যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে উমাইরগাঁও পূর্বপাড়ায় নিজ বাড়ির উত্তর-পূর্ব পাশে খাইরুল ইসলাম (২৪) নামে এক যুবকের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।

মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে শোক ও হতবাক পরিবেশ তৈরি হয়। সদ্য সৌদি আরব থেকে ফেরা, উদ্যমী এক তরুণের এমন মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছিল না। স্থানীয়রা জানান, খাইরুল দেড় মাস আগে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসেন। বিদেশে কয়েক বছর কাজ করে তিনি কিছুটা সঞ্চয় নিয়ে দেশে ফেরেন, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো থেমে গেল এক সকালে।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, খাইরুল সৌদি আরবে কাজ করতেন নির্মাণশ্রমিক হিসেবে। সেখানে প্রায় তিন বছর কাটানোর পর গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তিনি দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে কিছুদিন আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে বাড়িতেই সময় কাটাচ্ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি কিছুটা মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন। অনেক সময় একা একা বসে থাকতেন, রাতে ঘুম হতো না, কথাবার্তায়ও বিষণ্ণতার ছাপ ছিল।

বৃহস্পতিবার সকালেও পরিবারের সদস্যরা ভাবেন, খাইরুল হয়তো ঘুমোচ্ছে। কিন্তু পরে বাড়ির বাইরে উত্তর-পূর্ব পাশে তার দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন খাইরুল হয়তো অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখেন, আর কোনো নড়াচড়া নেই। তড়িঘড়ি করে স্থানীয়রা জালালাবাদ থানায় খবর দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

জালালাবাদ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুশফিক现场 উপস্থিত হয়ে লাশ উদ্ধার করেন এবং প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। তিনি জানান, খাইরুলের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে তার হাতের আঙুলগুলো নীলচে রঙ ধারণ করেছে এবং মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। এটি ইঙ্গিত দেয়, সম্ভবত কোনো বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণের কারণে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

এসআই মুশফিক বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হতে পারে। তবে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।” তিনি আরও জানান, “খাইরুল সৌদি থেকে ফেরার পর থেকেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি।”

পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে রিপোর্ট আসলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা ও খাইরুলের বন্ধুদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁরা বলছেন, খাইরুল ছিলেন পরিশ্রমী ও বিনয়ী স্বভাবের মানুষ। তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছে না। অনেকেই বলছেন, প্রবাস থেকে ফিরে মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় তরুণদের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করে। খাইরুলও হয়তো এমন অবস্থার মধ্য দিয়েই যাচ্ছিলেন।

একজন প্রতিবেশী জানান, “ও খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। আগে হাসিখুশি ছিল, এখন কিছুদিন ধরে একা একা থাকত। রাতে ঠিকমতো ঘুমাত না, কারও সঙ্গে তেমন কথা বলত না। মনে হয় কিছু নিয়ে চিন্তায় ছিল।”

পরিবারের সদস্যরাও জানাচ্ছেন, দেশে ফেরার পর খাইরুল কাজের সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু তেমন কিছু জোটাতে পারেননি। চাকরি বা ব্যবসা শুরু নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা তাকে ঘিরে ফেলেছিল। তাঁর বাবা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “ও বলত, দেশে এসে কিছু করতে চায়। কিন্তু কোনো দিকেই সাড়া পাচ্ছিল না। আমরা ওকে বুঝানোর চেষ্টা করতাম যে সময় লাগবে। কে জানত, এমন কিছু ঘটবে।”

গ্রামের মানুষও বলছেন, বিদেশ ফেরত অনেক তরুণ দেশে ফিরে নতুন করে মানিয়ে নিতে না পেরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে কর্মসংস্থান ও আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। খাইরুলের ঘটনাও হয়তো সেই বাস্তবতার এক নির্মম উদাহরণ।

এমন একটি মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানোর দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রবাসফেরত শ্রমিকদের জন্য দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শকেন্দ্র ও পুনর্বাসন কার্যক্রম থাকা জরুরি। কারণ বিদেশে দীর্ঘদিন একাকী পরিশ্রমের পর দেশে ফেরার বাস্তবতা অনেকের জন্য মানসিকভাবে কঠিন হয়ে ওঠে।

জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) জানিয়েছেন, “আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি।”

এদিকে খাইরুল ইসলামের জানাজা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গ্রামের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এলাকাবাসী, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কান্নায় এক শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তরুণ বয়সে এমন মৃত্যু যেন সবাইকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

খাইরুলের মা শোকে ভেঙে পড়েছেন। তিনি শুধু বলছিলেন, “ও তো কিছুদিন আগেই ফিরে এল, বলছিল মাকে একদিন খুব ভালো রাখবে। আজ ও নেই, আমার সব শেষ হয়ে গেল।”

এক তরুণ প্রবাসীর এমন মৃত্যুর ঘটনাটি যেন আরেকবার মনে করিয়ে দেয়, উন্নত জীবনের সন্ধানে প্রবাসে পাড়ি জমানো মানুষের যাত্রা কখনও কখনও কতটা কঠিন হতে পারে। অনেকেই দেশে ফিরে আসেন ভরসা ও স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু বাস্তবতার ভার তাদের কখনো কখনো দমিয়ে ফেলে।

সিলেটের উমাইরগাঁওয়ের এই তরুণের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষের মনে প্রশ্ন রেখে গেল—দেশে ফিরে কেন খাইরুলের জীবনটা এমনভাবে নিভে গেল? উত্তর খুঁজবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, কিন্তু তার আগেই সিলেটবাসীর হৃদয়ে জমে উঠেছে এক গভীর বেদনা ও অস্পষ্ট অনিশ্চয়তার ছায়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত