শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে বলামাত্রই গুলি ছোড়ে পুলিশ, সেই ভয়াল দিনের সাক্ষ্যে ভেসে উঠল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
রাজউক দুর্নীতি মামলায় বাদিকে আজ জেরা করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবী

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সোহান মৃধা। এক বছর পেরিয়ে গেলেও ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত দুপুরটি যেন চোখে ভাসে তার। সেই দিনটিতে আশুলিয়া থানার সামনে যে নির্মমতা সংঘটিত হয়েছিল, তা আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদালতে আবারও ফিরে এসেছে সাক্ষ্য হিসেবে।

বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেলে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ১১টার পর শুরু হয় ২১তম সাক্ষীর জবানবন্দি, যেখানে উপস্থিত ছিলেন গুলিবিদ্ধ ভুক্তভোগী সোহান মৃধা নিজেই। তার কথায় উঠে আসে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের ভয়াবহ বর্ণনা, যা শুনে আদালতজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা।

সোহান মৃধা বলেন, “গত বছরের ৫ই আগস্ট আমরা সাভারের বাইপাইল এলাকায় অবস্থান করছিলাম। দুপুরের দিকে খবর এল— শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে। আমরা সবাই আনন্দে বিজয় মিছিল বের করি। ঠিক তখনই আশুলিয়া থানার দিক থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। আমরা সেখানে গিয়ে পুলিশের উদ্দেশে বলি, ‘হাসিনা তো পালিয়ে গেছে, আপনারা কেন গুলি করছেন?’ এই কথাটিই বলা শেষ হতেই পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।”

তার কণ্ঠে আতঙ্ক, বেদনা এবং এক অমোচনীয় ক্ষোভ মিশে ছিল। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “চাইনিজ রাইফেলের গুলি আমার ডান উরুতে লাগে এবং ভেদ করে বেরিয়ে যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে শটগানের ছররা লাগে। আমি মাটিতে পড়ে যাই। আমার সঙ্গে থাকা সজল নামের এক ভাইকেও গুলি করে মাটিতে ফেলে দেয় পুলিশ। পরে জানতে পারি, সজলকে থানার সামনে ভ্যানে তুলে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়।”

আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সোহান তার গুলিবিদ্ধ পা ও হাতে থাকা ক্ষতস্থান দেখান। তিনি জানান, “আমার শরীর থেকে ১৭টি ছররা বের করা হয়েছে। ডান হাতে একটি পিলেট এখনো আছে। আমি প্রায় পাঁচ মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। এখনো হাঁটতে কষ্ট হয়, ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। পায়ে সাপোর্টিং ডিভাইস ব্যবহার না করলে হাঁটতে পারি না।”

এ মামলায় অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করছে। তাদের মধ্যে আটজন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তারা হলেন— সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, ডিবির সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, আশুলিয়া থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক আবদুল মালেক, আরাফাত উদ্দিন, কামরুল হাসান, শেখ আবজালুল হক এবং সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার।

অন্যদিকে সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ আটজন আসামি এখনো পলাতক। আদালত সূত্রে জানা যায়, এসব আসামির বিরুদ্ধেই আশুলিয়া থানার সামনে ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যাসহ সাতজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আগামী ৫ই নভেম্বর পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছে।

আদালত কক্ষে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, সোহান মৃধার জবানবন্দিতে পুরো পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে। তিনি যখন বলছিলেন, “আমরা বলেছিলাম, হাসিনা পালিয়েছে, তখন কেন গুলি করছেন?”, তখন অনেকেই নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার শরীরজুড়ে এখনো গুলির ক্ষতচিহ্ন, যা সেই দিনের বর্বরতার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

এই মামলার পাশাপাশি গতকাল ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি আলোচিত বিষয় উঠে আসে—একটি চট্টগ্রাম মহানগরের হত্যাকাণ্ড, আরেকটি গুমের মামলায় সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তার গ্রেপ্তার।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার সাইফুল ইসলামকে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্রদল নেতা ওয়াসিমসহ তিনজনকে হত্যার অভিযোগে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশন জানায়, গত বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে মুরাদপুর এলাকায় পুলিশি অভিযানের সময় শহীদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও ফারুক নামে তিন আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডে তখনকার কমিশনার সাইফুল ইসলামের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও সম্পৃক্ততা ছিল।

প্রসিকিউশন আরও জানায়, শুধু এই হত্যাকাণ্ডই নয়—চট্টগ্রাম জুড়ে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অন্তত ২৫টিরও বেশি মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের নেতৃত্ব দেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল সাইফুল ইসলামকে হাজিরের নির্দেশ দিলে গত ১৫ই অক্টোবর তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। এর আগে চান্দগাঁও থানার একটি মামলায় তিনি ১২ই ফেব্রুয়ারি থেকে কারাবন্দী ছিলেন।

অন্যদিকে, গুমের অভিযোগে এবার গ্রেপ্তার হয়েছেন পুলিশের আরেক সাবেক কর্মকর্তা—সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউর রহমান। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মতাদর্শের বহু মানুষকে গুমের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। আদালতে আগেই সাবেক আইজি চৌধুরী মামুন সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন, মশিউর রহমান বেশ কয়েকটি গুমের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কারাগারে পাঠিয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে একে একে উন্মোচিত হচ্ছে সেই সময়কার ভয়াবহ দমননীতি, পুলিশি নির্যাতন এবং নিখোঁজের ঘটনা। ট্রাইব্যুনালের একাধিক মামলায় উঠে আসছে রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে নির্বিচার হত্যার বর্ণনা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে।

সোহান মৃধার মতো বহু মানুষ এখনো বেঁচে আছেন দুঃসহ স্মৃতির ভার নিয়ে। তিনি বলেন, “আমি জীবিত আছি, কিন্তু আমার জীবন আর আগের মতো নয়। আজও রাতে ঘুমাতে পারি না। চোখ বন্ধ করলে সেই গুলির শব্দ, সেই আগুনে পুড়ে যাওয়া দেহগুলো দেখতে পাই। আমি ন্যায়বিচার চাই।”

তার এই এক বাক্য যেন পুরো জাতির প্রতিধ্বনি হয়ে শোনা যায়—ন্যায়বিচারের আহ্বান, সেই রক্তাক্ত দিনের জন্য, সেই মানুষগুলোর জন্য যারা অন্যায়ের প্রতিবাদে দাঁড়িয়েছিল এবং তার বিনিময়ে হারিয়েছিল জীবন, অঙ্গ কিংবা স্বপ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত