প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শিক্ষার্থী সংসদ ‘জকসু’ গঠনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান জানিয়েছেন, আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যেই তফসিল ঘোষণা করা হবে এবং ডিসেম্বরের ১০ তারিখের মধ্যেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এক নতুন প্রত্যাশার সঞ্চার হয়েছে—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অবশেষে তার নিজস্ব গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম ফিরে পাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি প্রতিনিধিত্বশীল ছাত্রসংসদের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের অভাব ছিল বহুদিনের অভিযোগ। মাত্র সাড়ে সাত একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত প্রধান ক্যাম্পাসে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চললেও শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন ও শিক্ষার মানে তার প্রভাব স্পষ্ট। কেরাণীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ এখনো চলমান থাকায় শিক্ষার্থীরা চান—জকসু নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সমস্যার কথা যেন শক্তভাবে প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো যায়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংসদ গঠনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অনেক শিক্ষার্থীই বলছেন, “জকসু কোনো দলের সংসদ নয়; এটি হবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ হাজার শিক্ষার্থীর যৌথ কণ্ঠস্বর।” দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত একটি শিক্ষার্থী সংসদ গঠনের প্রত্যাশা এখন সবার মুখে মুখে। অনেকেই মনে করছেন, এই নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব নির্বাচন নয়, বরং এটি হবে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চেতনা ও ঐক্যের পুনর্জাগরণ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জকসুর গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করেছে। সেই অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ২৩টি পদ থাকবে—এর মধ্যে সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ পদ ব্যতীত বাকি ২১ পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি প্রতিটি হল সংসদের ১৫টি পদের মধ্যে ১৩টিতে ভোটগ্রহণ হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতিমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে, যারা নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। সব মিলিয়ে ডিসেম্বরের নির্বাচনের প্রস্তুতি এখন পুরোদমে চলছে।
ছাত্রসংগঠনগুলোও ইতিমধ্যে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছে। বিভিন্ন সংগঠন প্রার্থী বাছাই, প্যানেল গঠন ও প্রচারণার কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে ছাত্রদল গঠনতন্ত্রে কিছু সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, “বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন স্বাধীন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও যেন তেমন একটি নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।” তার মতে, নির্বাচন যেন কোনোভাবেই নির্দিষ্ট পক্ষের প্রভাবাধীন না হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে জাতীয় ছাত্রশক্তির সদস্য সচিব শাহীন মিয়া বলেন, “সবার জন্য সমান সুযোগ ও অংশগ্রহণের পরিবেশ না থাকলে এই নির্বাচন তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না।” ছাত্রশিবির, আপ বাংলাদেশ ও ছাত্রঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠন দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, “আমরা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জবিতেও ইনক্লুসিভ প্যানেল ঘোষণা করব, যেখানে মেধা, যোগ্যতা ও অংশগ্রহণই হবে মুখ্য।” তার মতে, শিক্ষার্থীদের মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচন আয়োজনই হবে জকসুর সফলতার চাবিকাঠি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান জানান, কমিশন সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। “আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যেই আমরা তফসিল ঘোষণা করব,” বলেন তিনি। “আমাদের লক্ষ্য ডিসেম্বরের ১০ তারিখের মধ্যেই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা। সবকিছুই হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে।” তিনি আরও বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব গঠনের এই উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও প্রশাসনের অনেকেই এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন এক ইতিবাচক ধারা শুরু হওয়ার প্রত্যাশা করছেন। তারা মনে করেন, জকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি হবে। একইসঙ্গে এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার করবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীও এই নির্বাচনের খবর পেয়ে সামাজিক মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, “আমাদের সময় এমন সুযোগ থাকলে হয়তো শিক্ষার্থী জীবনের অনেক প্রাপ্তি ভিন্নভাবে লিখতে পারতাম।” অন্যরা মনে করছেন, এই নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব নির্বাচন নয়—এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক নতুন সূচনা।
সবশেষে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন অপেক্ষা করছে তফসিল ঘোষণার দিনের জন্য। অনেকেই বলছেন, ডিসেম্বরের সেই দিনটি শুধু ভোটের নয়—এটি হবে জবির শিক্ষার্থীদের বহু বছরের প্রত্যাশা পূরণের উৎসবের দিন।