প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, “আমাদের জুলাই সনদের দরকার নেই। দরকার এমন একটি সংসদ, যারা প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রকে বাস্তবায়ন করবে, জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেবে।” শনিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযোদ্ধা দলের আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এ সভায় মেজর (অব.) হাফিজ সরকারের ভূমিকা ও রাজনৈতিক দমননীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আজ যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা জনগণের কাছে ধোঁয়াশায় পরিণত হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অবদানও আজ গৌণ করে দেখানো হচ্ছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে বিএনপি ও জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলতে চায়। অথচ ইতিহাসে অমোচনীয়ভাবে লেখা আছে, কে স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন, কে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। “একটি স্বাধীন জাতিকে তার ইতিহাস ভুলিয়ে দিলে সেই জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না,”— মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনা সভায় মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন বলেন, “বর্তমান শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করেছে। আজ দেশের মানুষ ভোট দিতে পারে না, মত প্রকাশ করতে পারে না। সংবাদপত্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হচ্ছে। আমরা একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু আজ সেই বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একদলীয় দমননীতির রাষ্ট্রে।”
তিনি বলেন, “আমরা গণতন্ত্রের জন্য রক্ত দিয়েছি, শহীদেরা প্রাণ দিয়েছেন— তাদের আত্মত্যাগের প্রতি এটা চরম অবমাননা যে আজ মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। এই সরকারের যত দিন ক্ষমতায় থাকবে, তত দিন দেশের মানুষ মুক্তভাবে শ্বাস নিতে পারবে না।”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা প্রসঙ্গে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, “আজ ক্ষমতার লোভে কিছু ধর্মভিত্তিক দল ও সুবিধাভোগী শ্রেণি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিকৃত করছে। তারা গণতন্ত্রের কথা বলে, অথচ তাদের কাজ গণবিরোধী। জনগণ যদি একসাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তবে এই ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজয় নিশ্চিত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতা ও ন্যায়ের জন্য বাঙালি জাতির অস্তিত্বের লড়াই। আজ যারা এই সংগ্রামকে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করতে চায়, তারা দেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে।”
মেজর (অব.) হাফিজের বক্তব্যে সরকারের নীতির সমালোচনার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ঐক্যের আহ্বানও ছিল প্রবল। তিনি বলেন, “যারা যুদ্ধ করেছেন, যারা দেশ গঠনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের ইতিহাস আজ বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথে চালিত করা হচ্ছে। তাদের শেখানো হচ্ছে বিকৃত ইতিহাস, ভুল বীরত্বগাঁথা। এটা জাতির জন্য ভয়াবহ বার্তা।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই অপপ্রচার বরদাশত করব না। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে হবে নতুন প্রজন্মের সামনে। তাদের জানাতে হবে যে, এই দেশ ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। যারা সেই ত্যাগের কথা ভুলিয়ে দিতে চায়, তারা এই জাতির শত্রু।”
আলোচনায় উপস্থিত বক্তারা বর্তমান সরকারের নীতিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেন। তারা বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। বিচার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত সব জায়গায় দলীয়করণের ছায়া পড়েছে। এই অবস্থায় জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করা ছাড়া গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
মেজর (অব.) হাফিজ আহমদ বলেন, “আমাদের প্রয়োজন নতুন একটি সংসদ, যেখানে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদই পারে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে। কোনো কৃত্রিম বা সাজানো নির্বাচন নয়, আমরা চাই জনগণের নির্বাচিত সরকার।”
তিনি আরও বলেন, “এই সরকার যতই জুলাই সনদ বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিক, তা জনগণ বিশ্বাস করে না। জনগণ চায় পরিবর্তন, চায় ন্যায়বিচার, চায় মুক্ত পরিবেশে রাজনীতি করার অধিকার। এই অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না।”
তিনি দেশের তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “তোমরা নিরপেক্ষ থাকবে না। তোমরা এই দেশকে স্বাধীন করেছিলে বলেই আমরা গর্ব করতে পারি। এখন সময় এসেছে সেই গর্বকে আবার রক্ষা করার। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে তোমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।”
সভা শেষে মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতৃবৃন্দ বলেন, তারা শিগগিরই সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের বক্তব্য বিএনপির আসন্ন আন্দোলনের দিকনির্দেশনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। তিনি জুলাই সনদের প্রয়োজন নেই বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিএনপি এখন আর কোনো আলোচনাভিত্তিক বা সমঝোতামূলক সমাধানে আগ্রহী নয়। বরং তারা চাইছে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যা জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত ও গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ।
তার এই বক্তব্যে একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের প্রতি দৃঢ় অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে, অন্যদিকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি তীব্র অসন্তোষও প্রকাশ পেয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি নুরুজ্জামান মাহবুব, এবং উপস্থিত ছিলেন বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।
শেষে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা কোনো বিদেশি শক্তির সাহায্যে নয়, জনগণের শক্তিতেই এই সরকারকে পরিবর্তন করব। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মুক্তির সংগ্রাম থামবে না। জুলাই সনদ নয়, আমাদের প্রয়োজন জনগণের সনদ — একটি সংসদ, যা সত্যিকারের গণতন্ত্র বাস্তবায়ন করবে।”