প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ছনবাড়ী বাজারের নিকট একটি বালুর স্তূপের নিচ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে একটি বিদেশি রিভলবার, দুইটি ডেটোনেটর এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ২৫০ গ্রাম এক টুকরা বিস্ফোরক। স্থানীয় সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) এ অভিযান চালিয়ে শুক্রবার দুপুরে এই তথ্য নিশ্চিত করে। ঘটনার সময় সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবির একটি টহলদল কৌশলগত অবস্থান নেওয়ায় সন্দেহজনক চোরাকারবারিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে এবং পরে ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে এসব সামগ্রী পাওয়া যায়।
ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকেই স্থানীয় জনগণ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোদ্র-ছায়া যখন দেশজুড়ে প্রখর, তখন এমন ধরনের অস্ত্র ও বিস্ফোরক সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের প্রমাণ এই আশঙ্কাকে নতুন করে জাগিয়ে দিয়েছে যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ বা কেউ অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সিলেট বিভাগের ভূগোলগত অবস্থান, পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী বিস্তৃতি এবং ঘন জঙ্গলে সীমান্তরক্ষীদের চ্যালেঞ্জ প্রবল—এসব কারণেই সিলেটকে অনেকে অবৈধ চোরাচালানের হটস্পট হিসেবেই চিহ্নিত করেন।
বিজিবির কর্মকর্তারা বলেন, উদ্ধারকৃত সামগ্রী ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে এবং তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ড বা সন্ত্রাসী লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবহারের আশঙ্কায় মামলার তাৎপর্যসহ তদন্তে জোর দেয়া হচ্ছে। একই সময় সীমান্ত রক্ষা ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ অঙ্গিকার করে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতা জোরদার করেছে। তল্লাশির ধারা অব্যাহত থাকায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনো আটক করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
স্থানীয় নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, এটি কেবল একটি চোরাকারবারির বিচরণ নয়; বরং একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে। তারা সতর্ক করে বলছেন, এমন উপকরণ যদি জনসমাগমে কিংবা নির্বাচনী রাজনৈতিক উপস্থাপনায় ব্যবহার করা হয়, তা প্রাণহানিসহ ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা প্রশাসনকে দ্রুত ও স্বচ্ছ অনুসন্ধান চালিয়ে উৎস নির্ণয় করে রুদ্ধ করাসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন।
নাগরিক কমিটির নেতা বলেন, সীমান্ত দিয়ে এসব উপকরণ প্রবেশের পেছনে স্থানীয় সহযোগী হাত-ফুট থাকতে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশের টহল ও সীমান্তরক্ষীদের যুগপৎ কাজ আরও শক্তভাবে নিশ্চিত করা উচিৎ। রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসন এবং সীমান্ত সংশ্লিষ্ট জনগণের সহায়তায় একটি সমন্বিত নীতি ছাড়া এ ধরনের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হবেনা বলে তারা মনে করেন। এ সাক্ষাতে তারা আরও বলেন যে, নির্বাচনী সময় বিশেষত সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি, যান্ত্রিক-অ্যাকশন ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৎপরতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
একই সঙ্গে সুশাসন ও প্রতিবেশী এলাকার শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র কিংবা বিস্ফোরক আনা কেবলই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়, এটি গণতন্ত্রের ওপরও সরাসরি আঘাত। তারা বলছেন, নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে কেবলই সেনাবাহিনী বা সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সম্প্রদায় নেতৃবৃন্দ ও নাগরিক সমাজ মিলেই একটি ব্যাপক কার্যক্রম চালাতে হবে। বিশেষ করে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলির চিহ্নিতকরণ, সেগুলোতে স্থায়ী নজরদারি ও স্থানীয় লোকজনকে সজাগ রেখে সহযোগিতা নেবার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তাঁরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আরও বলেছেন যে, এই ধরনের অস্ত্র-উপকরণ প্রেরণের উৎস নির্ণয়ের জন্য আন্তঃসেবা সমন্বয় জরুরি। শুধুমাত্র সীমান্তরক্ষীদের টহল বাড়িয়ে অথবা এককালীন অভিযান চালিয়ে সমাধান আসবে না; দীর্ঘমেয়াদী গোয়েন্দা নজরদারি, অপরাধি চক্রের অর্থনৈতিক লেনদেন পট বাজারে নজরদারি, এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা চ্যানেলের ব্যুৎপত্তি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব জোগান দেওয়া হয়, তাহলে তার পেছনের রাজনৈতিক-মহাজজীবন সম্পর্ক নির্ণয় করাই হবে বিচার ও সিস্টেমের স্বার্থে অপরিহার্য।
স্থানীয় মানুষের মনোভাব মর্মস্পর্শী—তারা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষায় বিভোর। অনেকে বলছেন, ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু এমন খবর তাদেরকে গভীরভাবে ব্যাকুল করেছে। বালুকুচ এলাকা ও ঝোপঝাড়ে এমন উপকরণ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা থাকায় স্থানীয় জনগণও এখন আতঙ্কিত; স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিশুরা কিংবা গ্রামীণ বাজারে অতিসংকটকালীন সময়ে এমন কোনো বিস্ফোরক উপস্থিত হলে কী ঘটতে পারে—এই ভয় তাদের মনে বাসা বেঁধেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ধারকৃত উপকরণগুলোর ফরেনসিক ও ক্রিমিনাল বিশ্লেষণ শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন জনগণের কাছে তুলে ধরা হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি অনুসারে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী থানাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, বিজিবির টহল বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে মানুষকে নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা কর্মসূচি নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
শুরু থেকেই বিষয়টিকে তুলনামূলকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কারণ, নির্বাচন ঘিরে যে কোনো ক্ষুদ্রভাবে সংগঠিত সহিংসতাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এখন কড়া ও যৌথ উদ্যোগে এগোতে হবে। জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে—এটাই সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ। এই প্রত্যাশা নিয়েই এখন এলাকার মানুষ এবং প্রশাসন—দু’পক্ষেই সীমান্ত নিরাপত্তার দিকে তাকিয়ে আছে।