ডেঙ্গুর থাবায় আরও ৫ প্রাণহানি, হাসপাতালে ভর্তি সহস্রাধিক রোগী

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮৮-এ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সোমবার (৩ নভেম্বর) সকালে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রোববার সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে ১১৪৭ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ঢাকাতেই আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। যদিও রাজধানীর বাইরেও প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

গত কয়েক বছরের মতোই এবারও বর্ষার শেষে ও শরৎের শুরুতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৮২২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা।

রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে এখন ডেঙ্গু রোগীর ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, অনেক রোগী জটিল অবস্থায় ভর্তি হচ্ছেন, যাদের মধ্যে শিশু ও বয়স্করাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গুর এই বাড়তি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও জনসাধারণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানির জায়গা পরিষ্কার রাখা এবং সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মূল উপায়।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানালেন, তার পরিবারের তিন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনি বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই আশেপাশের কারও না কারও ডেঙ্গু হচ্ছে। ভয় লাগে, কিন্তু করণীয়ও খুব বেশি কিছু বুঝি না।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধই হতে পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানোর কার্যকর উপায়। তারা বলছেন, স্থানীয় সরকারকে নিয়মিত ফগিং, লার্ভা ধ্বংসে অভিযান এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখার।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, “ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং এটি এক দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জনবসতির ঘনত্ব ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বছর অক্টোবর-নভেম্বরেও সংক্রমণ কমেনি, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ডেঙ্গুর বিস্তার এখন বছরের প্রায় অর্ধেক সময় ধরেই সক্রিয় থাকে। এটি দেশের জন্য এক নতুন বাস্তবতা, যেখানে আগে কেবল বর্ষাকালেই ডেঙ্গু ছড়াত।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়ে যেমন আতঙ্কিত, তেমনি অনেকেই প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করছেন। তারা মনে করেন, কাগজে-কলমে অভিযান ও সচেতনতার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তা যথেষ্ট ফলপ্রসূ নয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের স্বাস্থ্য খাতে আরও সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ এবং জনসম্পৃক্ততা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

বাংলাদেশে প্রতি বছরই ডেঙ্গু আতঙ্ক নতুন করে ফিরে আসে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামাতে না পারা যেন এখন এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই আজও দেশের হাসপাতালগুলোতে দুঃখ, আতঙ্ক আর আশার লড়াই চলছে—একটি মশার কামড়ে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণের গল্প।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত