চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী হামলায় ফের আলোচনায় দুই সাজ্জাদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার
সন্ত্রাসী হামলায় দুই সাজ্জাদ ফের আলোচনায়

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরীতে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থীর গণসংযোগে গুলি চালিয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে কেটে গেছে পুরো একদিন। কিন্তু এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, হয়নি কোনো মামলাও। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তদন্তের গতি মন্থরই রয়ে গেছে। এর মধ্যেই এই হামলার পেছনে উঠে এসেছে দুই কুখ্যাত সন্ত্রাসী—বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের নাম। একজন বিদেশে, আরেকজন কারাগারে—তবু দুজনেরই নিয়ন্ত্রণে চলছিল সন্ত্রাসী রাজত্ব। তাদের নির্দেশেই বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি গণসংযোগে হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার চালিতাতলী এলাকায় বুধবার বিকেলে এই হামলায় নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা। ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হন এরশাদ উল্লাহ ও আরও দুজন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের তথ্যমতে, হামলাকারীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে বাবলার মাথায় পেছন থেকে গুলি করে। এই হত্যার নেতৃত্বে ছিলেন সাজ্জাদ গ্রুপের সদস্য রায়হান। আর নির্দেশ এসেছিল কারাগারে থাকা ছোট সাজ্জাদের কাছ থেকে।

পুলিশ জানায়, দুই সাজ্জাদের মধ্যে একজন দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। অন্যজন, ছোট সাজ্জাদ, চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি অবস্থাতেও তার বাহিনী পরিচালনা করছে একাধিক মোবাইল ফোন ও গোপন বার্তার মাধ্যমে। জেল থেকে প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট কোডওয়ার্ডে নির্দেশ পাঠানো হয়, যেগুলোর অর্থ শুধু বাহিনীর সদস্যরাই বোঝে। যেমন—‘চা বানাও’ মানে অপারেশন শুরু, ‘খাম পাঠাও’ মানে টাকা পৌঁছেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রিমোট কন্ট্রোল সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক দাঁড়িয়ে আছে তিনটি স্তম্ভের ওপর—প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা, আর রাজনৈতিক ছত্রছায়া। একাধিক সূত্রের দাবি, ছোট সাজ্জাদের জেলজীবন আসলে এক প্রহসন; তার চারপাশে কিছু কয়েদিকে ‘সহকারী’ হিসেবে রাখা হয়েছে যারা ফোন লুকিয়ে রাখে, চার্জ দেয়, এমনকি কথাও বলে বাইরে বার্তা পাঠায়।

পুলিশের এক তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, “সাজ্জাদ কখনো স্পষ্ট করে কিছু বলে না, ইঙ্গিতেই নির্দেশ দেয়। কথার ফাঁকে এমনভাবে বার্তা দেয় যে, বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলে কী করতে হবে।” আরেক কর্মকর্তা জানান, “এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে জেল প্রশাসনের ভেতরের যোগসাজশ খুঁজে বের করতে হবে, কারণ জেলের দেয়াল সাজ্জাদদের থামাতে পারছে না।”

এই সাজ্জাদদের নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত আরও কয়েকজন পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। নির্দেশনা এলে তারা শহরে নেমে অপারেশন চালিয়ে আবার ফিরে যায় গহিন পাহাড়ে। গত এক বছরে অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ড ও একাধিক সশস্ত্র হামলার সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়েছে।

এদিকে নিহত বাবলা নিজেও ছিলেন নগরীর তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির অন্তত ১৯টি মামলা রয়েছে। বাবলা ও ছোট সাজ্জাদ দুজনই ছিলেন বড় সাজ্জাদের ‘শিষ্য’। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই গুরুর অবস্থান বহু বছর ধরে দুবাইয়ে। তিনি সেখান থেকেই পরিচালনা করেন পুরো নেটওয়ার্ক। ২০১১ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর একসময় দুজনই জামিনে মুক্ত হয়ে কাতারে চলে যান এবং সেখান থেকেই চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

২০২০ সালে কাতার থেকে দেশে ফেরার পর বাবলা পুনরায় চট্টগ্রামে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন ছোট সাজ্জাদ দ্রুত তার জায়গা দখল করে নেয় এবং বড় সাজ্জাদের সমর্থন পায়। ফলে রাজত্ব হারিয়ে ক্ষুব্ধ হন বাবলা, আর সেখান থেকেই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বাবলা নিজের বাহিনী গড়ে তুলতে শুরু করেন এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

পুলিশ বলছে, বাবলার রাজনৈতিক যোগাযোগই তাকে নতুন করে আলোচনায় আনে। কারাগারে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে মুক্তির পর তিনি যুক্ত হন এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে। সম্প্রতি বাবলার বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা। দলের প্রচারণাতেও তাকে দেখা গেছে মঞ্চের পাশে। বুধবারও তিনি উপস্থিত ছিলেন এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে, যেখানে প্রাণ হারান নিজ দলের গুলিতেই।

পুলিশের ধারণা, ছোট সাজ্জাদের সহযোগীরা বাবলাকে দীর্ঘদিন ধরে টার্গেটে রেখেছিল। একাধিকবার হত্যাচেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার আর রেহাই মেলেনি। হত্যার ধরন থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এটি ছিল একেবারে ‘এক্সিকিউশন স্টাইল’ হত্যাকাণ্ড—নির্দেশনা অনুযায়ী কাছ থেকে মাথার পেছনে গুলি করা।

এ ঘটনায় পুলিশ এখন সাজ্জাদ গ্রুপের শীর্ষ সদস্যদের শনাক্ত করে ধরার চেষ্টা করছে। নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহত বাবলার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, “হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ধরতে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। সাজ্জাদ গ্রুপের নেটওয়ার্ক ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

চট্টগ্রামের এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নয়, বরং এটি উন্মোচন করেছে সন্ত্রাসী রাজত্বের এক ভয়ংকর রূপ—যেখানে একজন কারাবন্দি অপরাধীও প্রযুক্তি, প্রভাব ও অর্থের জোরে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সাজ্জাদদের এই “রিমোট কন্ট্রোল রাজত্ব” এখন পুলিশের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি শহরের সাধারণ মানুষের জন্যও নতুন এক আতঙ্কের নাম।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত