ভিয়েতনামে টাইফুন কালমেগির ভয়াবহ আঘাত, প্রাণ গেল তিনজনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪২ বার
ভিয়েতনামে টাইফুন কালমেগির ভয়াবহ আঘাত, প্রাণ গেল তিনজনের

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফিলিপাইনে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়ে এবার ভিয়েতনামে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী টাইফুন কালমেগি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘণ্টায় প্রায় ১৪৯ কিলোমিটার বেগে স্থলভাগে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়টি, যার প্রভাবে ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলীয় উপকূলজুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানিয়েছে, এই ঝড়ে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন অন্তত ডজনখানেক মানুষ।

জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে কালমেগি প্রথম স্থলভাগে আঘাত হানে। প্রবল বাতাস ও বৃষ্টিতে মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে যায় উপকূলীয় শহরগুলো। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বিপুল এলাকা, অনেক জায়গায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঝড়ের গতিবেগ এতটাই প্রবল ছিল যে, অনেক স্থানে বিশাল গাছ উপড়ে পড়ে, ছিঁড়ে যায় বৈদ্যুতিক তার, ঘরবাড়ি ভেঙে যায় মুহূর্তেই।

ভিয়েতনামের সরকারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঝড়ে নিহত তিনজনের মধ্যে দুইজন দা নাং প্রদেশে এবং একজন থুয়া থিয়েন হুয়ে অঞ্চলে মারা গেছেন। আহতদের অনেকেই গাছ ও দেয়াল চাপা পড়ে বা উড়ে যাওয়া টিনের আঘাতে আহত হন। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি ও বাজার। সাগর উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরার নৌকা ভেসে গেছে, বহু ট্রলার নিখোঁজ রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিং জরুরি বৈঠক ডেকে স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। উপকূলবর্তী সাতটি শহর ও প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ব্যাপক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে কোয়াং নাম, কোয়াং ngai, দা নাং ও থুয়া থিয়েন হুয়ে অঞ্চলে।

বিবিসি ও ভিয়েতনাম নিউজ জানিয়েছে, দুর্যোগের আগেই প্রশাসন কয়েকদিন ধরে সতর্কতা জারি করেছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও প্রধান এক্সপ্রেসওয়েগুলো বন্ধ রাখা হয়। বাতিল করা হয় শতাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। স্কুল ও অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত।

দা নাং শহরের স্থানীয় এক বাসিন্দা ট্রান মিন আন বিবিসিকে জানান, “রাতের দিকে বাতাসের গতি এতটাই বেড়ে যায় যে, পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠছিল। আমরা ছোট্ট একটা রুমে আশ্রয় নিয়ে প্রার্থনা করছিলাম, যেন কোনোভাবে বেঁচে যাই।” ঝড়ের পর সকালে ঘর থেকে বের হয়ে দেখেন, তার আশেপাশের অর্ধেক ঘরবাড়িই আর দাঁড়িয়ে নেই।

কালমেগির তাণ্ডবে সাগরে তোলা বিশাল ঢেউ ৬ থেকে ৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল বলে জানিয়েছে ভিয়েতনামের উপকূলরক্ষী বাহিনী। বহু নৌযান ও জাহাজ নিরাপদ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু নৌযানের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। উদ্ধারকর্মীরা সাগরে অনুসন্ধান অভিযান শুরু করেছে।

ভিয়েতনামের ইতিহাসে প্রায় প্রতি বছরই টাইফুন আঘাত হানে, তবে কালমেগির মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সাম্প্রতিক সময়ে খুব একটা দেখা যায়নি। ২০০৬ সালের জ্যানসেন ও ২০২০ সালের মোলাভের পর এটিকেই সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দুটোই বাড়ছে, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, কালমেগি এখন পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে কম্বোডিয়া ও লাওসের দিকে যাচ্ছে। সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত ও বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই দেশেই সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বিপদাপন্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধার দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ভিয়েতনামের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি ডং ছাড়িয়ে গেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোর পুনর্গঠন শুরু হয়েছে সেনাবাহিনীর সহায়তায়। ত্রাণ বিতরণের জন্য কয়েকটি হেলিকপ্টার ও নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা (OCHA) বলেছে, স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকা ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে জরুরি সাড়া দল।

প্রবল টাইফুনের ধাক্কায় ভিয়েতনাম যেন এক রাতেই থমকে গেছে। শহরজুড়ে ধ্বংসস্তূপ, গ্রামজুড়ে পানি আর আতঙ্ক। তবে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, উদ্ধারকর্মীরা রাতদিন কাজ করছেন জীবনের চিহ্ন খুঁজে পাওয়ার আশায়। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত দেশের মধ্যাঞ্চলে জরুরি সতর্কতা জারি থাকবে।

ভিয়েতনামের জনগণ এখন অপেক্ষা করছে, কখন থামবে প্রকৃতির এই নির্মম ক্রোধ, কখন আবার ফিরবে তাদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত