এআই’র প্রভাব: চাকরি হারাচ্ছেন না, বদলাচ্ছে কাজের ধরন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৭ বার
এআই কি সত্যিই কেড়ে নিচ্ছে আমার-আপনার চাকরি

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্তমান কর্পোরেট জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আলোচনা তীব্রভাবে চলছেই। বিশেষ করে প্রশ্নটি উঠেছে, প্রযুক্তির এই দ্রুত বিকাশ কি সত্যিই মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা এবং সাম্প্রতিক ঘটনার আলোকে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালের পর থেকে যেসব পেশায় এআই ব্যবহার বেড়েছে, সেসব ক্ষেত্রের কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সব ছাঁটাই বা বেকারত্বের পেছনে এআই দায়ী নয়, বরং এটি একাংশে ব্যবসায়িক পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক চক্রের অংশ।

পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরগান ফ্র্যাঙ্ক বলেন, “চ্যাটজিপিটি চালুর পর প্রশাসনিক ও অফিস সহায়তাকারী পেশায় বেকারত্ব বেড়েছে, কিন্তু টেক পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা যায়নি।” এটি নির্দেশ করছে যে প্রযুক্তির ব্যবহার মূলত কিছু নির্দিষ্ট কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে সহায়তা করেছে, কিন্তু পুরো অর্থনৈতিক খাতের জন্য এটি একেবারেই ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে তারা প্রায় ১৪ হাজার করপোরেট কর্মী ছাঁটাই করবে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে তারা আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হতে চায়। এই ঘোষণার পরই প্রযুক্তি খাতে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চেগ ইতিমধ্যেই এআই প্রযুক্তির বাস্তবতা উল্লেখ করে তাদের কর্মীসংখ্যা ৪৫ শতাংশ কমিয়েছে। সেলসফোর্সও ৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং তাদের জায়গায় এআই–চালিত কাস্টমার সার্ভিস এজেন্ট ব্যবহার করছে। ইউপিএসও গত এক বছরে প্রায় ৪৮ হাজার চাকরি কমিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সব ছাঁটাইয়ের পেছনে কেবল এআই দায়ী নয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ল্যাবের নির্বাহী পরিচালক মার্থা গিম্বেল বলেন, “সবাই এখন এআই নিয়ে এত উদ্বিগ্ন যে, কোনো কোম্পানি কর্মী কমালেই আমরা ধরে নিই, এটি শুধু এআইয়ের প্রভাব। বাস্তবে, অনেক সময় এটি ব্যবসায়িক পুনর্গঠন বা অর্থনৈতিক শাখার প্রভাব।” অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনার সময় যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামানো হলে প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক নিয়োগ হয়েছিল। এখন সেই অতিরিক্ত কর্মীসংখ্যা কমানো হচ্ছে, যা মূলত স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চক্রের অংশ।

অ্যামাজনের মতো বড় প্রতিষ্ঠান একদিকে এআই প্রযুক্তির উদ্ভাবক, তেমনি ব্যবহারকারীও। তাই তারা সহজেই কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে সক্ষম হচ্ছে। এতে কর্মীরা একই ধরনের কাজের জন্য কম প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে, কিন্তু নতুন পেশা ও ভূমিকা তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআই বড় ধরনের বেকারত্ব সৃষ্টি করছে এমনটি বলা এখনও নির্ভুল নয়। বরং চাকরির প্রকৃতি বদলাচ্ছে—কেউ চাকরি হারাচ্ছেন, কেউ নতুন ধরনের দায়িত্ব পাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাপী টেক খাতে এআই–এর প্রভাব নিয়ে গবেষণার দিক থেকেও দেখা গেছে, কিছু পেশা যেমন প্রশাসনিক সহায়ক, ডেটা এন্ট্রি, কল সেন্টার বা নির্দিষ্ট কাস্টমার সার্ভিসে এআই ব্যবহার বেড়েছে, সেখানে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে। অন্যদিকে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবারসিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং অন্যান্য প্রযুক্তি-ভিত্তিক পেশায় মানুষের চাহিদা এখনো অপরিবর্তিত বা বেড়েই চলেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চাকরির বাজারে নতুন দক্ষতার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, এআই পরিচালনা, প্রোগ্রামিং, ডেটা মডেলিং এবং রোবটিক প্রসেস অটোমেশনে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে চাকরি হারানোর শঙ্কা থাকলেও নতুন চাকরির ক্ষেত্রও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এআই–এর বাস্তব প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যাচ্ছে, এটি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। এটি মূলত কাজের ধরন পরিবর্তন করছে। কিছু অনুরূপ দায়িত্ব কমে গেছে, কিন্তু সেই জায়গায় নতুন প্রযুক্তি সংক্রান্ত কাজের সুযোগ এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষ নতুন চাকরিতে মানিয়ে নিতে পারবে।

বিশেষ করে কর্পোরেট দুনিয়ায় এআই–এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোম্পানিগুলো আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হতে চাইছে। তবে এটি মানবিক এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ—কর্মী যেন হঠাৎ বেকার না হন এবং নতুন দক্ষতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং মানুষের কর্মসংস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, এআই মানুষের চাকরি সরাসরি ‘কেড়ে নিচ্ছে’ না, বরং চাকরির ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা পরিবর্তন করছে। প্রশাসনিক এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে মানুষের অংশ কমছে, তবে নতুন প্রযুক্তি নির্ভর ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। চাকরির বাজারে এক ধরনের পরিবর্তন চলছে যা ভবিষ্যতে কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে।

মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এআই–এর দ্রুত ব্যবহার মানব সমাজের জন্য দারুণ সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। এটি কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত প্রস্তুতির প্রশ্নও বটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত