১৫ মাস পরও জুলাইয়ের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রহস্য ও বিতর্ক অব্যাহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৮ বার
১৫ মাস পরও জুলাইয়ের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রহস্য ও বিতর্ক অব্যাহত

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর পেরিয়ে গেছে দেড় বছরের বেশি সময়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই আন্দোলনে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি হিসাব, রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন—সব জায়গায়ই একে অপরের সঙ্গে মেলে না। এতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে নাগরিক সমাজ ও শহীদ পরিবারের মধ্যে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তালিকায় শহীদের সংখ্যা ছিল ৮৩৪। পরে ১০ জনের নাম যোগ হলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪। তবে পরবর্তীতে তালিকা থেকে আটজনের নাম বাদ দেওয়া হয়, ফলে সরকারি হিসেবে এখন শহীদের সংখ্যা ৮৩৬। কিন্তু এই হিসাব নিয়েই রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন সংগঠন বলছে, অনেকের নাম ভুলভাবে তালিকায় ঢোকানো হয়েছে, আবার প্রকৃত শহীদের নাম বাদ পড়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, শহীদের সংখ্যা ৮২০-এর বেশি, কিন্তু তালিকায় রয়েছে ৮৪৫ জনের নাম। আবার ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি সংগঠন তাদের তালিকায় শহীদের সংখ্যা দেখিয়েছে ৯১৪। এমনকি সংগঠনটি দাবি করেছে, আরও ৬০০ জনের তথ্য তারা যাচাই করছে।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিহতের সংখ্যা হতে পারে ১ হাজার ৪০০ জন। এই সংখ্যাটিই পরবর্তীতে বিভিন্ন মহলে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়।

সরকারি বক্তব্যেও অসঙ্গতি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে শহীদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। কোথাও তিনি বলেছেন “প্রায় দেড় হাজার”, কোথাও বলেছেন “হাজার হাজার”, আবার কখনো বলেছেন “৮৩৪ শহীদ পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে”। এই ভিন্নতার কারণে সরকারি হিসাব নিয়ে সংশয় আরও বেড়েছে।

তাঁর সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা ২ হাজারের কাছাকাছি। অপরদিকে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, “সহস্রাধিক নিরস্ত্র নাগরিক নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়।”

রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি আরও বিস্তৃত

জামায়াতে ইসলামী প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে ৭১৬ জনের নাম শহীদ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবে দলটির দাবি, এই সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদও জাতিসংঘের পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, “অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন শহীদ হয়েছেন, অথচ সরকার এখনো প্রকৃত তালিকা প্রকাশে ব্যর্থ।”

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেনও একই অভিযোগ করেছেন। তাঁর মতে, এক বছর পরও শহীদদের তালিকা চূড়ান্ত না হওয়া সরকারের ব্যর্থতা।

সরকারের অবস্থান ও চলমান যাচাই-বাছাই

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন জানিয়েছেন, জাতিসংঘের তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের কাছে আসেনি। সরকারি হিসেবে শহীদের সংখ্যা এখন ৮৩৬, যা হাসপাতাল ও জেলা প্রশাসনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তবে ডিএনএ যাচাইয়ের মাধ্যমে রায়েরবাজারে কবর দেওয়া অজ্ঞাত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত হলে সংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে।

তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর হিসাব চূড়ান্ত করতে গেলে শুধু প্রশাসনিক তথ্য নয়, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের সাক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই কাজ এখনো শুরু হয়নি।

জাতি এখনো অপেক্ষায়

১৫ মাস কেটে যাওয়ার পরও শহীদের সংখ্যা নিয়ে এই অস্পষ্টতা জাতির এক নতুন ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনো অপেক্ষা করছেন তাঁদের স্বজনের স্বীকৃতির জন্য। অনেকেই বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের মতো জুলাই শহীদদের ইতিহাসও যেন বিভ্রান্তির মধ্যে হারিয়ে না যায়।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মন্তব্য করেছেন, “এটা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটা রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতা। শহীদদের সংখ্যা নিয়ে দ্বিধা থাকলে ইতিহাসই বিকৃত হবে।”

অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এখনো তালিকা যাচাই করছে। তবে কবে নাগাদ প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত