টিটিপাড়ায় ৬ লেনের রেলওয়ে আন্ডারপাস চালু: দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
টিটিপাড়ায় ৬ লেনের রেলওয়ে আন্ডারপাস চালু: দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকার মানুষের জন্য আজকের দিনটি এক অনন্য স্বস্তির দিন। বহু প্রতীক্ষিত টিটিপাড়ার ছয় লেনের রেলওয়ে আন্ডারপাস আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। উদ্বোধনের পর থেকেই জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই আন্ডারপাস দিয়ে চলছে যানবাহনের নিয়মিত চলাচল। বহু বছরের যানজট, অপেক্ষা আর ধৈর্যের পরীক্ষা শেষ করে আজ যেন নতুন এক পথ খুলে গেছে নগরবাসীর জন্য।

শনিবার (৮ নভেম্বর) সকালে আধুনিক এই আন্ডারপাসটির উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আরেক বিশেষ সহকারী শেখ মইন উদ্দিন। উদ্বোধনের পরপরই এলাকাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা ফুল ছিটিয়ে এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের আনন্দ প্রকাশ করেন।

নির্মিত আন্ডারপাসটির নকশা ও অবকাঠামো দেশের অন্যতম আধুনিক প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ছয় লেনের এই আন্ডারপাসের মধ্যে চার লেনে চলবে যান্ত্রিক যানবাহন—যেমন প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেল। বাকি দুই পাশে রাখা হয়েছে রিকশা ও সাইকেলের জন্য আলাদা লেন। পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত প্রশস্ত ফুটপাত। ৫ মিটার উচ্চতার যেকোনো যানবাহন সহজে পার হতে পারবে নিচ দিয়ে। ফলে যানবাহন চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না এবং রেললাইনের উপরে-নিচে যান চলাচল আলাদা হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে যাবে।

এর আগে টিটিপাড়া রেলক্রসিং ছিল রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম ও ভোগান্তিপূর্ণ স্থান। ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় ক্রসিং বন্ধ থাকত, আর তখন শুরু হতো দীর্ঘ যানজট। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল—মাত্র আধা কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে কখনো কখনো এক ঘণ্টাও লেগে যেত। বিশেষ করে অফিস সময় কিংবা স্কুল ছুটির সময় এলাকাজুড়ে সড়ক হয়ে উঠত এক প্রকার ‘চলন্ত পার্কিং লট’। অনেকেই খিলগাঁও, গোলাপবাগ কিংবা সায়েদাবাদ ঘুরে বিকল্প পথে যেতে বাধ্য হতেন, ফলে সময়, জ্বালানি ও ধৈর্য—সবকিছুই ক্ষয়ে যেত।

এখন সেই দুর্ভোগের অবসান ঘটতে চলেছে। টিটিপাড়ার আন্ডারপাস চালুর ফলে মতিঝিল, মুগদা, মান্ডা, মানিক নগর ও সবুজবাগ এলাকার সঙ্গে রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকার যোগাযোগ হবে আরও সহজ ও দ্রুত। ট্রেনের সিগনালে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হবে না। রেলওয়ে ও সড়ক—দুটোই তাদের নিজ নিজ গতিতে চলবে, কোনো কিছুর সঙ্গে সংঘর্ষ ছাড়াই। এটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং নগরবাসীর জন্য এক যুগান্তকারী স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

উদ্বোধনের সময় বক্তারা বলেন, আন্ডারপাসটি শুধু যানজট নিরসনের জন্যই নয়, বরং নগর পরিকল্পনায় এক বড় ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব অংশের পরিবহন নেটওয়ার্কে গতি আসবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আশা করছেন, এই এলাকায় এখন বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে, সম্পত্তির মূল্য বাড়বে এবং মানুষের জীবনযাত্রা আরও সহজ হবে।

তবে কিছু নাগরিক উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, আন্ডারপাস চালু হলেও এটি সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হলে অল্পদিনের মধ্যেই সমস্যা দেখা দিতে পারে। জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত আলো বা অপরিচ্ছন্নতা যদি দেখা দেয়, তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির সুফল হারিয়ে যেতে পারে। এই বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই হাতে নেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, টিটিপাড়া আন্ডারপাসটি যাতে সব সময় কার্যকর ও নিরাপদ থাকে, সেই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, কমলাপুর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের চলমান নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্ডারপাসের শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে না। মেট্রোরেল সংযুক্ত হলে এলাকাটিতে যান চলাচল আরও সহজ হবে, এবং পুরো অঞ্চলের পরিবহন কাঠামোতে আসবে এক বড় পরিবর্তন।

দিনের শুরুতে উদ্বোধন হলেও দুপুর থেকেই দেখা যায়—ট্রেনের গর্জনের সঙ্গে সমান্তরালে নিচ দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে বিভিন্ন যানবাহন। সেই পুরনো রেলক্রসিংয়ের দীর্ঘ সারি আর ক্লান্ত মুখগুলো এখন ইতিহাস। টিটিপাড়া, যা একসময় যানজটের প্রতীক ছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে ঢাকার গতিশীলতার এক নতুন প্রতীকে।

মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই উন্নয়ন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন প্রমাণ করছে, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে রাজধানীর যানজটও একদিন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। টিটিপাড়ার এই আন্ডারপাস যেন তারই এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকল—যেখানে উন্নয়ন শুধু কাঠামোগত নয়, মানুষের স্বস্তি ও স্বপ্নের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে গভীরভাবে।

ঢাকার মানুষের কাছে তাই আজকের দিনটি এক নতুন সূচনার দিন। ট্রেন চলবে তার রেলপথে, আর মানুষ ও যানবাহন চলবে বাধাহীনভাবে নিজেদের পথে—এ যেন রাজধানীর বুক জুড়ে চলমান জীবনের এক নতুন ছন্দ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত