প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে যখন রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আলোচনার ঝড় বইছে, ঠিক সেই সময় ভিন্ন এক সুরে কথা বললেন প্রধান উপদেষ্টার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। শনিবার সকালে রাজশাহী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন—নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে তিনি রাজশাহীতে আসেননি। এই সংযত ও কৌশলী উত্তরই যেন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে।
রাজশাহী টিটিসি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ পরিদর্শন কার্যক্রমে সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। কেন্দ্রের প্রশিক্ষণার্থী ও কর্মকর্তারা উপদেষ্টাকে বরণ করে নেন করতালি আর শুভেচ্ছায়। উপস্থিত সাংবাদিকরা যখন নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, তখন ড. আসিফ হাসিমুখে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “নির্বাচনের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে আমি রাজশাহীতে আসিনি।” তার এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে একদিকে যেমন দায়িত্বশীল সরকারি পদধারীর সংযম ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নীরবতারও এক বিশেষ বার্তা লুকিয়ে আছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
পরিদর্শন শেষে উপদেষ্টা টিটিসির কার্যক্রম সম্পর্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি বলেন, “প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সারাদেশে এখন শতাধিক টিটিসি কাজ করছে, যেখানে হাজারো তরুণ-তরুণী বিভিন্ন পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে।”
রাজশাহীর এই কেন্দ্র সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রশংসা করে তিনি বলেন, “রাজশাহী টিটিসি বিশেষ করে মেয়েদের জন্য একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। এখানে মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও আত্মনির্ভর হওয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের নারী কর্মশক্তিকে এগিয়ে নিতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।”
এর আগে সকাল ১০টার দিকে ড. আসিফ নজরুল রাজশাহী টিটিসিতে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এবং কেন্দ্রের প্রিন্সিপালসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শাখা ঘুরে দেখেন, প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা জানতে চান। প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “দক্ষতা অর্জনই আজকের দিনে সবচেয়ে বড় সম্পদ। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। তরুণ প্রজন্ম যদি নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে।”
ড. আসিফ নজরুলের এই বক্তব্য যেমন শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেছে, তেমনি রাজনৈতিক মহলেও তার সংযত আচরণ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব যেখানে প্রতিনিয়ত বিতর্কে লিপ্ত, সেখানে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে তার এমন নীরব অবস্থানকে অনেকে ‘বিবেচনাপ্রসূত’ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ড. আসিফ নজরুল দেশের রাজনীতি ও আইনের জগতে একজন প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় ব্যক্তি। তার স্পষ্টভাষী চরিত্র ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাই নির্বাচন নিয়ে তিনি নীরব থাকায় বিষয়টি শুধু সাংবাদিক মহলেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি সচেতনভাবেই মন্তব্য থেকে বিরত থেকেছেন যাতে কোনো বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না হয় বা ভুলভাবে ব্যাখ্যা না পায়।
এদিকে পরিদর্শন শেষে টিটিসির কর্মকর্তারা জানান, আইন উপদেষ্টার সফর তাদের জন্য অনুপ্রেরণার। তিনি প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ কারিকুলাম আধুনিকীকরণ এবং মেয়েদের জন্য নতুন প্রশিক্ষণ সুযোগ তৈরির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। বিশেষ করে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ইংরেজি ভাষা প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল স্কিল উন্নয়নের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
রাজশাহী টিটিসির এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, “স্যার আমাদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলেছেন, তাতে আমরা অনেক উৎসাহ পেয়েছি। তিনি বলেছেন, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো দক্ষতা অর্জন। আমরা এখন আরও আগ্রহ নিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি।”
এই সফরের মাধ্যমে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রাজশাহীর তরুণ সমাজের মধ্যে এক ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে তার ‘নির্বাচন বিষয়ে মন্তব্য না করার’ সিদ্ধান্ত রাজনীতির অন্দরমহলে কৌতূহল তৈরি করেছে। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনকালীন সময়ের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় এটি ছিল পরিপক্ব ও কৌশলগত পদক্ষেপ। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এই নীরবতার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের কোনো ইঙ্গিত।
রাজশাহীর স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, উপদেষ্টার সফর ঘিরে শুরু থেকেই এলাকাবাসীর আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রের সামনে ভিড় জমিয়েছিলেন সাধারণ মানুষও, অনেকে কেবল এক ঝলক দেখার আশায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার সফর শেষে অনেকে মন্তব্য করেন—“তিনি যে বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন, সেটাই হয়তো সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে উঠবে।”
দিনের শেষভাগে রাজশাহী ছাড়ার আগে ড. আসিফ নজরুল আরও একবার প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “যে দেশে দক্ষ মানুষের অভাব থাকবে না, সে দেশ কখনও পিছিয়ে থাকবে না। রাজশাহীর তরুণরা সেই সম্ভাবনার প্রতীক।” তার এই উক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই, যেখানে প্রশংসার পাশাপাশি রাজনৈতিক কৌতূহলও যুক্ত হয়।
সবশেষে বলা যায়, রাজশাহীর এই সফরে ড. আসিফ নজরুলের মূল মনোযোগ ছিল শিক্ষা ও কর্মসংস্থান উন্নয়নে, তবে তার সংযত নীরবতা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মনে রেখে গেছে অনেক প্রশ্ন। তিনি যে উদ্দেশ্যে রাজশাহী গিয়েছিলেন—সেই লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছে নিঃসন্দেহে; কিন্তু তিনি যে বিষয়ে কথা বলেননি, সেটিই এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রাজনীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনের এই সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আইন উপদেষ্টার সংযম হয়তো নতুন এক বার্তা দিচ্ছে—কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্য হয়ে ওঠে।










