প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত উন্নয়ন প্রকল্পে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। গরিব মানুষের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে যে প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল, সেটি এখন পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের এক করুণ দৃষ্টান্তে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে মাত্র এক মাস বাকি, অথচ কাজের অগ্রগতি ৫০ শতাংশের নিচে। সম্পন্ন কাজগুলোর মান নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন, যা বিশ্বব্যাংকের তহবিল ব্যবহারে সরকারের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই স্যানিটেশন সুবিধা ও নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ৮০ শতাংশ পাবলিক টয়লেট ইতিমধ্যেই অচল, অব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। একইভাবে অধিকাংশ পানি সরবরাহ স্কিমে কাজ হয়েছে নিম্নমানের, অনেক ক্ষেত্রেই নকশা অনুযায়ী কাজ করা হয়নি।
সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরপত্রে নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হয়নি। যেসব এলাকায় মাঠ পর্যায়ে কাজ করা হয়েছে, সেখানেও অনিয়মের ছাপ স্পষ্ট। পানির পাইপলাইন বসানো, টয়লেট নির্মাণ এবং হাত ধোয়ার স্টেশন স্থাপন—সব জায়গাতেই দেখা গেছে ঘাটতি, ত্রুটি এবং মানহীন নির্মাণকাজ।
পরিদর্শনকৃত ছোট পানির স্কিমগুলোর প্রায় অর্ধেকই বন্ধ হয়ে গেছে। ৪৭টি স্কিমের মধ্যে মাত্র ৪টিতে কাজ হয়েছে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, বাকিগুলোতে মাটির গভীরতা, পাইপের মান বা নির্মাণ সামগ্রীর মান ছিল নিম্নস্তরের। টয়লেটগুলোর র্যাম্প, গাইড ওয়াল বা বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। এমনকি কিছু টয়লেট নির্মাণের পর একবারও ব্যবহৃত হয়নি। স্থানীয় জনগণ জানান, অনেক টয়লেট বছরের ২-৩ দিন খোলা থাকলেও বাকি সময় তা বন্ধই থাকে।
পরিদর্শিত ৩৬টি হাত ধোয়ার স্টেশনের মধ্যে মাত্র ১১টি এখনো ব্যবহারযোগ্য, বাকিগুলোতে ফিটিংস নষ্ট, টাইলস ভাঙা, কিংবা পানিতে অতিরিক্ত আয়রনের কারণে তা ব্যবহার অনুপযোগী। এমনকি অনেক টয়লেটে পানি বা পরিষ্কারক সামগ্রী রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক টয়লেটের মধ্যে ১৭টি ব্যবহারের অযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে।
এই ভয়াবহ দুর্নীতির পেছনে মূল ভূমিকায় রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প অর্থ লোপাট করেছেন। প্রকল্পের বিল অনুমোদন ও চেক ইস্যুতে একচ্ছত্র ক্ষমতা ব্যবহার করে তবিবুর রহমান পছন্দের ঠিকাদারদের অনুকূলে কাজ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো প্রকল্পে পিডির অনুমোদন ছাড়া কোনো কাজ হয় না। তার একক স্বাক্ষরেই কোটি কোটি টাকার বিল ছাড় হয়েছে। অথচ মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই, মাননিয়ন্ত্রণ বা কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনায় ছিল চরম অবহেলা।
যুগান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দুর্নীতির টাকায় তবিবুর রহমান দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ শহরে ছয়তলা একটি ভবন, ধানমন্ডি এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট, ব্যাংককে একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, এমনকি বাণিজ্যিক ফ্লোর—সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, তার ব্যক্তিগত জীবনে নারী কেলেঙ্কারি, একাধিক বিয়ে এবং নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেও প্রভাব খাটিয়ে তিনি তদন্ত প্রক্রিয়া ভিন্ন পথে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বিভিন্ন মহলে তবিবুর রহমানকে ‘অতিপ্রভাবশালী কর্মকর্তা’ হিসেবে দেখা হয়। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকর্ম করেও পদে বহাল আছেন বলে জানা গেছে।
অবাক করা বিষয় হলো, এই ভয়াবহ অনিয়মের মাঝেও তাকে আবারও নতুন করে ১৮৮৯ কোটি টাকার একটি স্যানিটেশন প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নেই শুরু হতে যাচ্ছে এই নতুন প্রকল্প। ফলে পুরোনো দুর্নীতির দায় মিটানোর আগেই নতুন লুটপাটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী বলেন, “আইএমইডির প্রতিবেদনটি আমার নজরে আসেনি। তবে আমরা বিষয়টি দেখব। যদি প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাই, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক তবিবুর রহমান তালুকদার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, “আমি এসব বিষয়ে মোবাইলে কথা বলব না, সামনাসামনি আসলে কথা বলা যাবে।”
এই প্রকল্পের দুর্নীতি কেবল সরকারি অর্থের অপচয় নয়; এটি দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি চরম অবহেলার প্রতীক। যারা এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী হওয়ার কথা ছিল—গ্রামীণ নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী—তারা আজও নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনিয়ম, আত্মসাৎ ও জবাবদিহির অভাবের এই চক্র যেন থামছেই না।
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দুর্নীতি এখন নতুন কিছু নয়, তবে আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থে পরিচালিত এমন একটি প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম দেশীয় ও বৈদেশিক উভয় পর্যায়েই সরকারের ভাবমূর্তিতে গভীর দাগ ফেলেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের অর্থায়ন পুনর্বিবেচনা করতে পারে—এমন আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নয়, বরং নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থই যখন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছায় না। গরিবের টয়লেট প্রকল্প এখন দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে, আর সেই প্রতীকের নাম মো. তবিবুর রহমান তালুকদার—যিনি সরকারি পদে থেকেও রাষ্ট্রের আস্থা, জনগণের বিশ্বাস ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি এক ভয়াবহ আঘাত হেনেছেন।