উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে নবযুগের সূচনা, উদ্বোধন হলো নগরবাড়ী নদী বন্দর আধুনিক টার্মিনাল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭৭ বার
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে নবযুগের সূচনা, উদ্বোধন হলো নগরবাড়ী নদী বন্দর আধুনিক টার্মিনাল

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নগরবাড়ী নদী বন্দরে আজ শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। নদীবন্দর অবকাঠামোয় যুক্ত হলো আধুনিকতার ছোঁয়া। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো ‘নগরবাড়ী নদী বন্দর আধুনিক টার্মিনাল কমপ্লেক্স’। শনিবার সকাল ১১টায় বন্দর প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে এই টার্মিনালের উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা। উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব দেলোয়ারা বেগম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, নাবিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং এলাকাবাসী।

উদ্বোধনী মঞ্চে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর দোয়া ও মোনাজাত শেষে টার্মিনালের ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা। উদ্বোধনের পর তিনি নতুন টার্মিনালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং নির্মাণকারীদের প্রশংসা করেন।

‘নগরবাড়ীতে আনুষাঙ্গিক সুবিধাদিসহ নদী বন্দর নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সঙ্গে দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় নৌযোগাযোগ উন্নয়নের এক বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৮ সালের ২০ জুন, আর বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় একই বছরের ১ জুলাই। সাত বছরের দীর্ঘ পরিশ্রম ও পরিকল্পনার ফসল হিসেবে ২০২৫ সালের ৩০ জুনে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হয়। মোট ৫৫৬.৯০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এই আধুনিক টার্মিনাল কমপ্লেক্স শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের এক নতুন প্রতীক।

যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত নগরবাড়ী ঘাট দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত। বহু দশক ধরে এখান দিয়ে সার, সিমেন্ট, পাথর, কয়লা, বালি ও খাদ্যপণ্যসহ নানা ধরনের বাল্ক সামগ্রী পরিবহন হয়ে থাকে। এসব পণ্য দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে নৌপথে এসে নগরবাড়ীতে পৌঁছায়, এরপর সড়কপথে পৌঁছে যায় রাজশাহী, রংপুর, নওগাঁ, দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়।

১৯৮৩ সালে এই ঘাট আরিচা নদী বন্দরের আওতায় আসে, যা তৎকালীন সময়ে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নৌপথের প্রাণকেন্দ্র ছিল। যমুনা সেতু নির্মাণের আগে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত আরিচা-নগরবাড়ী ফেরিঘাট ছিল দেশের দুই অংশ—দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু সেতু চালুর পর নদীপথে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড কিছুটা হ্রাস পায়। পরবর্তীতে নদীবন্দর পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নতুন প্রাণ সঞ্চারের উদ্যোগ নেয় সরকার।

আজকের উদ্বোধন সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উন্নয়ন পরিকল্পনারই বাস্তব প্রতিফলন। নতুন টার্মিনালটিতে আধুনিক জেটি, পণ্য লোড-আনলোডিং সুবিধা, সংরক্ষণাগার, অফিস কমপ্লেক্স, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যাত্রীসুবিধা সংবলিত অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনে দ্রুততা ও নিরাপত্তা পাবেন, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি ঘটবে।

উদ্বোধনী বক্তব্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সরকার নদীবন্দরগুলোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। নগরবাড়ী নদী বন্দর আধুনিক টার্মিনাল কমপ্লেক্স উত্তরবঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। এটি কেবল একটি টার্মিনাল নয়, বরং দেশের পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে নদীপথে সংযুক্ত করার এক গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে।”

তিনি আরও বলেন, “নদীপথ বাংলাদেশের প্রাণ, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই খাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। আধুনিক টার্মিনাল ও বন্দরব্যবস্থা গড়ে তুললে জলপথ আবারও হবে দেশের প্রধান বাণিজ্য রুট। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, সড়কপথের চাপ হ্রাস পাবে, আর পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে উঠবে।”

বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা তার বক্তব্যে বলেন, “নগরবাড়ী বন্দর শুধু পাবনা নয়, বরং পুরো উত্তরবঙ্গের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ। এখান থেকে নৌপথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোংলা, খুলনা ও বরিশালের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। ফলে কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্য পরিবহন আরও সাশ্রয়ী ও দ্রুত হবে।”

অনুষ্ঠানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, আধুনিক টার্মিনালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে এক বিপ্লব ঘটবে। কৃষিপণ্যের পাশাপাশি শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহনে খরচ ও সময় দুই-ই কমবে। স্থানীয় তরুণ প্রজন্মও এই উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

উদ্বোধনের পর নগরবাড়ী নদী বন্দরের তীরে দেখা গেছে উৎসবের আমেজ। নদীর ওপারে নৌযান ও লঞ্চে থাকা যাত্রীরা হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে এই ঘাটের ইতিহাস জানি। একসময় এটি উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা ছিল। আজ আবার মনে হচ্ছে সেই দিন ফিরে আসছে।”

নগরবাড়ী নদী বন্দর আধুনিক টার্মিনাল কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, এটি বাংলাদেশের নদীপথভিত্তিক বাণিজ্যের পুনর্জাগরণের প্রতীক। দেশের জলপথে আধুনিকতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার যে সেতুবন্ধন আজ নগরবাড়ীতে শুরু হলো, তা উত্তরবঙ্গের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সারাদেশের বাণিজ্য কাঠামোতেও নতুন গতি সঞ্চার করবে।

নদী ও মানুষের সম্পর্ক বাংলাদেশে গভীর ও প্রাচীন। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় নগরবাড়ী এখন হয়ে উঠছে আধুনিকতার প্রতীক—একটি নতুন দিগন্ত, যেখানে ঐতিহ্য ও উন্নয়ন একসূত্রে বাঁধা পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের স্বপ্নের সঙ্গে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত