যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘায়ু গবেষক ও একাডেমি ফর হেলথ এন্ড লাইফস্প্যান রিসার্চের সভাপতি ড. নির বারজিলাই জানিয়েছেন, প্রতিটি মানুষের মৃত্যুই অনিবার্য, তবে সেই দিন পর্যন্ত সুস্থ ও সক্রিয়ভাবে বাঁচা সম্ভব। টাইম ম্যাগাজিনে সম্প্রতি প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা এমন এক সময়ে পৌঁছাচ্ছি যেখানে বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। নিউইয়র্কের অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অফ মেডিসিনের ইনস্টিটিউট ফর এজিং রিসার্চের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা এই গবেষক মনে করেন, বয়স বৃদ্ধিই হৃদরোগ, ক্যানসার ও আলঝেইমারের মতো রোগের মূল চালিকা শক্তি।
ড. বারজিলাইয়ের মতে, বয়সের জৈবিক প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা গেলে এসব রোগও বিলম্বিত করা সম্ভব। ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নির্দিষ্ট ওষুধের মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বয়স বাড়া অবশ্যই অবশ্যম্ভাবী নয়, বরং পরিবর্তনযোগ্য। মৃত্যুই অনিবার্য, কিন্তু বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার লক্ষ্য হলো মানুষকে এমনভাবে বাঁচানো যাতে বৃদ্ধ বয়সেও সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকা যায়।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, চিরজীবী হওয়া তার লক্ষ্য নয়, বরং মানুষের সুস্থ আয়ু বৃদ্ধি করাই প্রাধান্য পাচ্ছে। গত ১৫০ বছরে মানুষের গড় আয়ু ২০–৩০ বছর থেকে বেড়ে ৭০–৮০ বছরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কৃষি, বিশুদ্ধ পানি, টিকাদান এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতির কারণে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। তবে আজকাল মানুষ নতুন ধরনের বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যেমন আলঝেইমার, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ, যা আগে মূলত বয়স্কদের মধ্যেই দেখা যেত।
ড. বারজিলাইয়ের গবেষণা দলের তথ্য অনুযায়ী, শতবর্ষী মানুষরা সাধারণ মানুষের তুলনায় ৩০ বছর দেরিতে রোগে আক্রান্ত হন এবং জীবনের শেষ কয়েক বছর অসুস্থ থাকেন। এদের মধ্যে দীর্ঘায়ুর পেছনে জিনগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই জিন থেকে ওষুধ তৈরি করা সম্ভব। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ছোট কুকুর বড় কুকুরের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে। ল্যাবরেটরিতে দেখা গেছে, গ্রোথ হরমোন বন্ধ করলে প্রাণী দীর্ঘায়ু হয়। প্রায় ৬০ শতাংশ শতবর্ষীর জিনে এমন পরিবর্তন আছে যা গ্রোথ হরমোনের কার্যকারিতা সীমিত করে। যুবক বয়সে হরমোন উপকারী হলেও বৃদ্ধ বয়সে তা ক্ষতিকর হতে পারে।
ভাল ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য এবং সামাজিক যোগাযোগ বয়স কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তবে বাজারে প্রচলিত যৌবন ফিরিয়ে আনার সাপ্লিমেন্টগুলোতে প্রভাবশালী উপাদান নাও থাকতে পারে এবং ক্ষতিকরও হতে পারে। তিনি নিজে প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘণ্টা উপবাস করেন, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে, পেশির গঠন ঠিক রাখতে এবং মানসিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ড. বারজিলাই দীর্ঘায়ু গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি, মাইটোকন্ড্রিয়া পুনরুজ্জীবন এবং কোষের ‘রি-প্রোগ্রামিং’ সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপিতে ঘন অক্সিজেন চেম্বারে নির্দিষ্ট সময় থাকলে কোষের বয়স কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মাইটোকন্ড্রিয়া থেরাপিতে রক্তে নতুন মাইটোকন্ড্রিয়া যুক্ত করে শক্তি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো কোষের বয়স উল্টো ঘোরানো বা ‘রি-প্রোগ্রামিং’, যা কোষকে যুবক বয়সের মতো আচরণ করতে শেখায় এবং বার্ধক্যজনিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।
ড. বারজিলাইয়ের ভাষ্য, “আমাদের লক্ষ্য অমর হওয়া নয়, বরং এমনভাবে বাঁচা যাতে খুব বৃদ্ধ বয়সেও তরুণের মতো জীবনযাপন করা যায়।