প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা একাধিক মানিলন্ডারিং মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, বিদেশি বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় ৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের অভিযোগে দায়ের করা ১৭টি মামলার অভিযোগপত্র খুব শিগগিরই আদালতে দাখিল করা হবে।
রবিবার দুপুরে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে নানা পর্যায়ে তদন্ত চালানোর পর পুলিশ এখন নিশ্চিত হয়েছে যে, বিদেশি বাণিজ্যের নামে একাধিক ভুয়া এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এসব লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যাংক ও বিদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামও তদন্তে উঠে এসেছে।
জসীম উদ্দিন বলেন, “আমাদের তদন্তে স্পষ্টভাবে প্রমাণ মিলেছে যে, বিদেশি বাণিজ্যের আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করেছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সালমান এফ রহমান ও তার ব্যবসায়িক সহযোগীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এখন আমরা তদন্তের শেষ পর্যায়ে এবং খুব শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করব।”
এই তথ্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, সালমান এফ রহমান শুধুমাত্র একজন ব্যবসায়ী নন—তিনি ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবেও পরিচিত। তার বিরুদ্ধে এত বড় আর্থিক অপরাধের অভিযোগ উঠায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে চাপ ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা একাধিক এলসির মাধ্যমে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করা হয়। এই অর্থের গন্তব্য হিসেবে হংকং, সিঙ্গাপুর, দুবাই এবং যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন কোম্পানির নাম পাওয়া গেছে। তবে এসব কোম্পানির বেশিরভাগই কাগজে-কলমে অস্তিত্বহীন বা সন্দেহজনক বলে মনে করেছে তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অর্থপাচারের এই প্রক্রিয়ায় বাণিজ্যিক আমদানি-রপ্তানির ভুয়া নথি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে, বিদেশ থেকে যেসব পণ্য আমদানির কথা বলা হয়েছিল, তার অধিকাংশই বাস্তবে দেশে প্রবেশ করেনি। বরং সেই অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের আড়ালে বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
এই ঘটনায় বেক্সিমকো গ্রুপের বেশ কিছু সাবেক কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ স্বীকার করেছেন যে, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে নির্দিষ্ট কিছু নথি তৈরি করা হয়েছিল। সিআইডি বলছে, তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
তবে এ বিষয়ে বেক্সিমকো গ্রুপের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাদের এক মুখপাত্র বলেছেন, “বেক্সিমকো সবসময় আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। কোনো অনিয়ম বা অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে কোম্পানি বা তার শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্ত নন। আমরা বিশ্বাস করি, আইনি প্রক্রিয়ায় সত্য প্রমাণিত হবে।”
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলাটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অর্থপাচার শুধু অর্থনীতিকেই দুর্বল করে না, দেশের সুনাম ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে এটি দেশের বৃহৎ কর্পোরেট সেক্টরের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।
একই সঙ্গে এই মামলা রাজনৈতিক প্রভাবও ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ সালমান এফ রহমান দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন, বিনিয়োগ আহ্বান ও বিদেশি অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিতে সক্রিয় ছিলেন। তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তিতেও আঘাত হানতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক অপরাধের যেসব অভিযোগ আড়ালে থেকে যায়, এই মামলা তার ব্যতিক্রম। অনেকে আবার প্রশ্ন তুলছেন, এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার কি সত্যিই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে?
সিআইডি কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব বিবেচনা না করেই তদন্ত সম্পন্ন করছেন। বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, “আমাদের তদন্ত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর। আমরা যাদের নাম পেয়েছি, তাদের সবাইকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনব, তাদের অবস্থান বা পরিচয় যাই হোক না কেন।”
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল হলে এটি বাংলাদেশের আর্থিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ, এর মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে, দেশের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি আইন থেকে মুক্ত নন।
দেশের অর্থনীতি এখন যে সংকটকাল অতিক্রম করছে, সেখানে বৈদেশিক মুদ্রার পাচার রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে ডলার সংকট ও রেমিট্যান্স ঘাটতির কারণে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সালমান এফ রহমানের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং অভিযোগ সরকারের জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাইকোর্টে অভিযোগপত্র দাখিলের পর আদালত প্রাথমিক শুনানি শেষে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন বলে জানা গেছে। এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাও বাংলাদেশের এই মামলাটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ৯৭ মিলিয়ন ডলার অর্থপাচারের এই মামলাগুলো শুধু একটি কর্পোরেট কেলেঙ্কারি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, আর্থিক নীতি ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তদন্ত শেষ পর্যায়ে এবং অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি যখন চলছে, তখন দেশবাসী তাকিয়ে আছে—আসলে এই মামলার মাধ্যমে কি সত্যিই প্রভাবশালীদের আইনি জবাবদিহিতার নতুন যুগ সূচিত হবে? নাকি এটিও শেষ পর্যন্ত অন্য অনেক মামলার মতো সময়ের গহ্বরে হারিয়ে যাবে? সময়ই সেই উত্তর দেবে।