প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্যে কড়া প্রতিক্রিয়া ঢাকার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্যে কড়া প্রতিক্রিয়া ঢাকার

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্যকে “অসত্য, অনভিপ্রেত ও অসম্মানজনক” বলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঢাকার কূটনৈতিক মহলে এ মন্তব্যকে দেখা হচ্ছে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টিকারী এক পদক্ষেপ হিসেবে।

রোববার (৯ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলম বলেন, “ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আমাদের নজরে এসেছে। আমরা মনে করি, রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্যটি সম্পূর্ণ অসত্য এবং এটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। একইসঙ্গে এ ধরনের মন্তব্য কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও সৌজন্যের প্রতিও অসম্মানজনক।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সবসময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আমরা আশা করি, উভয় দেশ এমন সব মন্তব্য এড়িয়ে চলবে যা ভুল ব্যাখ্যা সৃষ্টি করতে পারে বা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ঘটাতে পারে।”

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি নেটওয়ার্ক১৮ গ্রুপের প্রধান সম্পাদক রাহুল যোশীকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “নয়াদিল্লি ঢাকার সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক চায় না, এবং অধ্যাপক ইউনূসের উচিত তিনি কী বলছেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।” তাঁর এই মন্তব্যের ভিডিও ও উদ্ধৃতি দ্রুতই ভারতের বিভিন্ন অনলাইন ও টেলিভিশন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এ মন্তব্য নিয়ে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক সংবেদনশীল সময়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা কেবল ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে অসম্মানিত করাই নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে সৌহার্দ্যপূর্ণ। এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতিক্রম করছে, তখন ভারতের শীর্ষ একজন মন্ত্রীর এই মন্তব্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়।”

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যেই ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ রেখেছে বলে জানা গেছে। ঢাকা চায়, দিল্লি যেন মন্তব্যটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান পরিষ্কার করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ধরনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ নষ্ট করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় উন্মোচন করেছে। তাঁর আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতের মতো প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তির পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক।

ঢাকার রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় শিবিরের নেতারা একমত যে, বিদেশি নেতাদের উচিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “যখন কোনো দেশের মন্ত্রী অন্য দেশের নেতৃত্ব নিয়ে পরামর্শ বা সমালোচনা করেন, তখন তা শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনই নয়, বরং প্রতিবেশী সম্পর্কের ভেতরে সন্দেহের বীজ বপন করে।”

উল্লেখ্য, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মহলে তিনি মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক সংস্কারক হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইতিবাচক নজর কেড়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ সবসময়ই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করেছে। দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বন্ধন ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যা উভয় দেশের জনগণের জন্য উপকারী। তাই যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি বা অনভিপ্রেত মন্তব্য দ্রুত সংশোধনের মাধ্যমে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সময়ের দাবি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাহবুবুল আলম বলেন, “বাংলাদেশ সবসময় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। আমরা আশা করি, ভারতও একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি দেখবে।”

ঢাকার কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনাটি আপাতত দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করলেও, উভয় পক্ষের বিচক্ষণ পদক্ষেপের মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুতই সমাধান হবে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেন এমন মন্তব্য পুনরায় না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন উভয় দেশের কূটনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে, দেশের সাধারণ নাগরিকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অনেকে বলছেন, বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব নিয়ে বিদেশি নেতাদের মন্তব্য করা দুঃখজনক। একইসঙ্গে তাঁরা আশা প্রকাশ করছেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গভীর ঐতিহ্য এই অস্থায়ী উত্তেজনা অতিক্রম করে আবারও সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

সর্বোপরি, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহল একমত যে, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, যা রক্ষায় উভয় পক্ষেরই সংযম ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা জরুরি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতি সেই দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন—যেখানে দৃঢ়তা আছে, আবার সম্পর্ক রক্ষার কূটনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত