রাজউক দুর্নীতি মামলায় বাদিকে আজ জেরা করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবী

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
রাজউক দুর্নীতি মামলায় বাদিকে আজ জেরা করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবী

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর বহুল আলোচিত রাজউক দুর্নীতি মামলার বিচারিক কার্যক্রমে আজ গুরুত্বপূর্ণ দিন। মামলার বাদিকে জেরা করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। সোমবার (১০ নভেম্বর) ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে অনুষ্ঠিত হবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়ের করা এই মামলার পরবর্তী শুনানি। আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার বাদির জেরা শেষে তদন্ত কর্মকর্তা ও অন্যান্য সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে।

এই মামলাটি ঘিরে গত কয়েক মাস ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ২০ কাঠা জমির প্লট অবৈধভাবে বরাদ্দ নিয়েছিলেন তারা।

দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২২ সালের দিকে রাজউকের এই জমিগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয় ভিআইপি কোটায়, যেখানে সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। বরাদ্দের আবেদনটি প্রথমে রাজউকের প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে “বিশেষ নির্দেশে” অনুমোদন দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু সময় ধরে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলে রাজউকের ভেতরেও, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তে নেয়।

তদন্তের অংশ হিসেবে দুদক গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করে। মামলাগুলোর মধ্যে একটিতে প্রধান আসামি হিসেবে নাম রয়েছে শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের। বাকিগুলোতে রাজউকের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে। দুদকের দাবি, এসব প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় জমির বিপুল ক্ষতি হয়েছে এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ উপেক্ষা করে সুবিধা আদায় করা হয়েছে।

এই মামলায় ইতোমধ্যেই রাজউকের সাবেক পরিচালক খুরশিদ আলমকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও তার আইনজীবী দাবি করেছেন, জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে।

এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, পুরো মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এতে বাস্তব প্রমাণের অভাব রয়েছে। তাদের বক্তব্য, প্লট বরাদ্দের প্রক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক এবং রাজউকের নীতিমালা অনুসারেই সম্পন্ন। তারা আরও দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্যই এই মামলাগুলো করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দুদকের পক্ষের কৌঁসুলি আদালতে জানিয়েছেন, তাদের হাতে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে। দুদকের আইনজীবী আবদুল মতিন আদালতে বলেন, “আমরা দেখাতে পারব কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই জমি বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি নীতিমালা পাশ কাটিয়ে বিশেষ সুবিধা আদায় করা হয়েছে।”

আদালত সূত্র জানায়, আজকের শুনানিতে মামলার বাদিকে জেরা করবেন আসামিপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব হোসেন। তিনি এর আগে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে করা পৃথক মামলায়ও তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেছিলেন। সেই জেরা আজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান সকালে এই মামলার শুনানি শুরু করবেন বলে জানা গেছে। বিচারক এর আগে বলেছেন, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চায় আদালত, তবে উভয় পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ শোনার পরই রায় দেওয়া হবে।

রাজধানীর কাকরাইলের দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সকাল থেকেই মিডিয়া কর্মীদের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। আদালতের ভেতরেও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের ঢোকার অনুমতি সীমিত রাখা হয়েছে, তবে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে সাংবাদিকরা আইনজীবীদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করছেন।

উল্লেখ্য, গত বছর থেকেই রাজউক ও সরকারি প্লট বরাদ্দের নানা অভিযোগে বেশ কিছু মামলা চলছে। তার মধ্যে এই মামলাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কারণ এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যের নাম রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলার ফলাফল বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার তদন্তে আরও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হতে পারে। তাদের দাবি, এই মামলায় “প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা” থাকা সত্ত্বেও তদন্তের কাজ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় যেদিকেই যাক না কেন, এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, এখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রশাসনিক নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মুখোমুখি হয়েছে আদালতের কাঠগড়ায়।

আজকের শুনানির পর মামলার পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করবেন বিচারক। আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার পরবর্তী ধাপে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা ও রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে।

ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বাইরে এক আইনজীবী বলেন, “আজকের শুনানিই নির্ধারণ করবে মামলার ভবিষ্যৎ গতি। বাদির জেরা শেষে বোঝা যাবে মামলার ভিত্তি কতটা মজবুত।”

রাজধানীর সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এ মামলাকে ঘিরে আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ এটিকে “দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সাহসী পদক্ষেপ” হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন “এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল।”

সব মিলিয়ে আজকের দিনটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে থাকছে। আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ, আর প্রশ্ন একটাই—আইনের চোখে সবাই কি সত্যিই সমান?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত