প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাপানের পূর্ব উপকূলে আবারও কেঁপে উঠেছে ভূমি। স্থানীয় সময় রোববার সকাল ৮টা ৩ মিনিটে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ইওয়াতে প্রিফেকচারের উপকূলের কাছে। ভয়াল এই ভূকম্পনের পরপরই দেশটির আবহাওয়া সংস্থা সুনামির সতর্কতা জারি করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবু উপকূলীয় এলাকাগুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক মানুষ ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অব ফায়ার অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় জাপান প্রায়শই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকে। এই ভূকম্পনও সেই সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলেরই অংশ, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে নিয়মিত কম্পন সৃষ্টি হয়।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ইওয়াতে উপকূলীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ২৮ ফুট (প্রায় এক মিটার) পর্যন্ত উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। এর প্রেক্ষিতে উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া সংস্থা জানায়, এটি আপাতত মাঝারি মাত্রার সতর্কতা, তবে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে, তাই সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইওয়াতে ও মিয়াগি অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভবনগুলো কেঁপে ওঠে। অনেকেই আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দেখা যায়, দোকানপাট ও বাড়িঘরের ভেতরে আসবাবপত্র কেঁপে ওঠায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যদিও গুরুতর ধ্বংসযজ্ঞের খবর এখনো পাওয়া যায়নি। তবু প্রশাসন কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। উপকূলবর্তী স্কুল, হাসপাতাল এবং কারখানাগুলোতে জরুরি সরিয়ে নেওয়ার মহড়া চালানো হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা ভূমিকম্পের পরপরই জরুরি বৈঠক ডাকেন। তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়নের কাজ শুরু করেছি। জনগণের নিরাপত্তাই এখন আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। সবাইকে শান্ত থাকতে এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে অনুরোধ করছি।”
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, প্রতিরক্ষা বাহিনী, পুলিশ এবং দমকল বিভাগকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে যেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা যায়। জাপানের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর বেশ কিছু রেললাইন ও মেট্রো সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে, তবে দ্রুত তা পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে।
অন্যদিকে, টোকিও থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেনদাই শহরেও ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই জানিয়েছেন, তাদের ভবনের জানালা ও ফার্নিচার দুলে উঠেছিল। অনেক স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের মাঠে সরিয়ে নেওয়া হয়।
জাপান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। এখানে প্রতি বছর গড়ে ১,৫০০-রও বেশি ছোট-বড় ভূমিকম্প হয়। তবে ৬ মাত্রার ওপরে ভূমিকম্প হলে সেটি গুরুতর বলে বিবেচিত হয়, কারণ তা ভবন ও অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভূমিকম্পটি ২০১১ সালের সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যখন ৯ মাত্রার এক ভূমিকম্প ও পরবর্তী সুনামিতে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
জাপানের ভূমিকম্প প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিশ্বে অন্যতম উন্নত। ভবনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন বড় ধরনের কম্পনেও টিকে থাকতে পারে। এবারও সেই প্রযুক্তিই দেশটিকে বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। তবে তাঁরা সতর্ক করেছেন, ভূমিকম্পের পর আফটারশক বা ছোট ছোট কম্পনের সম্ভাবনা রয়ে গেছে, যা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটতে পারে।
ইওয়াতে প্রিফেকচারের গভর্নর তাতসুয়া কিমুরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা জনগণকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। সুনামির সতর্কতা এখনো বলবৎ আছে। উপকূলীয় এলাকা থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ।” তিনি আরও জানান, প্রশাসন জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, জাপানের ভূমিকম্প সংক্রান্ত সতর্কতা ব্যবস্থা অত্যন্ত দ্রুত কাজ করে। ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেশের টেলিভিশন, মোবাইল অ্যাপ, রেডিও ও ট্রেন স্টেশনে সতর্কবার্তা বাজতে শুরু করে। এর ফলে মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারেন, যা প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে “সাবডাকশন জোন” বা নিমজ্জন অঞ্চলে এই ভূমিকম্পের সূত্রপাত। এখানে ফিলিপাইন সাগরীয় টেকটোনিক প্লেট জাপান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে, ফলে সময় সময় শক্তি সঞ্চিত হয়ে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাঁরা আরও সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এদিকে, জাপান সরকার জনগণকে সতর্ক থেকে তথ্য অনুসারে চলার আহ্বান জানিয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং পর্যটকদেরও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, “ভূমিকম্প আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিবারই ভয়টা নতুন করে ফিরে আসে।”
বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতি খুব বেশি না হলেও, জাপান প্রশাসন এখনো উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। কারণ, ভূমিকম্পের প্রকৃত প্রভাব ও পরবর্তী ঢেউয়ের আঘাত নিরূপণ করতে সময় লাগে। এদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকেও জাপানের প্রতি সহমর্মিতা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তা করার লক্ষ্যে।
এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির স্মৃতি এখনো জাপানিদের মনে তাজা। সেই অভিজ্ঞতাই এবার তাদের সতর্ক করেছে আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে। যদিও এই ভূমিকম্পে তেমন ক্ষতি হয়নি, তবে তা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—প্রকৃতির শক্তি কতটা অনিশ্চিত, আর মানুষ কতটা ক্ষুদ্র তার সামনে।
জাপান আজও সেই প্রস্তুত জাতি, যারা প্রতিটি বিপর্যয়ের পর নতুন করে উঠে দাঁড়াতে জানে। এবারের ভূমিকম্পও তাদের সেই দৃঢ়তা ও সংগঠিত সক্ষমতার আরেকটি পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।