আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শীর মর্মস্পর্শী সাক্ষ্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১০ বার
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শীর মর্মস্পর্শী সাক্ষ্য

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সোমবার (১০ নভেম্বর)। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ অনুষ্ঠিত হয় মামলার দশম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ, যেখানে উপস্থিত ছিলেন হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকিব রেজা খান। তিনি আদালতের সামনে তুলে ধরেন সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত, যখন সহপাঠী আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

দীর্ঘ তিনটি ধার্য তারিখে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় মামলার অগ্রগতি কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সোমবারের সাক্ষ্যগ্রহণে পুরো আদালত কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আকিবের মুখে শোনা সেই ভয়াল ঘটনার বর্ণনায়। তিনি বলেন, “গুলি লাগার পর আবু সাঈদ মাটিতে পড়ে যান। তাঁর বন্ধু আয়ান ও রওনক তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনও পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে।”

আকিব জানান, ১৬ জুলাইয়ের সেই দুপুরে বেরোবি ক্যাম্পাসের বাইরে বিক্ষোভ চলাকালে আকস্মিকভাবে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। “প্রথমে লাঠিচার্জ, তারপর টিয়ারশেল, আর শেষে গুলিবর্ষণ। সাঈদ তখনও স্লোগান দিচ্ছিলেন—ঠিক তখনই তিনি গুলিবিদ্ধ হন,” বলেন তিনি। আদালতে কথা বলতে গিয়ে আকিবের কণ্ঠ বারবার থেমে যায়, কিন্তু তাঁর কথাগুলো যেন প্রতিটি শ্রোতার হৃদয়ে আঘাত করে।

এই মামলাটি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। সাঈদ ছিলেন জুলাই আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা এক তরুণ—যার মৃত্যু সেদিন শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, বেদনা ও প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

মামলার প্রসিকিউশন জানায়, এই সাক্ষ্য ছিল পুরো মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ এটি হত্যার সরাসরি চিত্র আদালতের সামনে তুলে ধরেছে। তারা বলেন, “প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য আদালতের কাছে সত্য উদ্ঘাটনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। আকিব রেজা যা বলেছেন, তা তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গেও মিলছে।”

আদালত জানায়, পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিনগুলোতে আরও কয়েকজন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীকে হাজির করা হবে। পাশাপাশি ঘটনার সময়কার ভিডিও, ছবি ও মেডিক্যাল রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। ট্রাইব্যুনাল এদিন সাক্ষীর বক্তব্য আদালতের রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে।

এদিকে, একই দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আরেক ঘটনায়, রাজধানীর রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করে হত্যার মামলায়ও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। দুটি মামলা এখন জনআকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে—মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে এগুলোকে।

সাক্ষ্য শেষে আদালত প্রাঙ্গণে বেরোবি শিক্ষার্থী আকিব রেজা সাংবাদিকদের বলেন, “আমি যা দেখেছি, তা সত্য করে বলেছি। সাঈদ ভাইকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। আমি চেয়েছি যেন সত্যিটা দেশের মানুষ জানতে পারে।” তাঁর চোখে জল আর কণ্ঠে কাঁপন ছিল, কিন্তু কথায় ছিল সাহস ও দৃঢ়তা।

মামলাটির বিচারিক অগ্রগতি এখন নতুন গতি পেয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে হত্যার পূর্ণ বিবরণ আদালতে আসায় মামলার প্রমাণ কাঠামো আরও শক্ত হলো। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সাক্ষ্য আদালতের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি মামলার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গণমানুষের কণ্ঠের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেই আন্দোলন, সেই রক্ত, সেই অঙ্গীকার আজ আবার প্রতিধ্বনিত হলো আদালতের কাঠগড়ায়। আকিবের সাক্ষ্য যেন মনে করিয়ে দিল, শহীদের রক্ত বৃথা যায় না, ন্যায়বিচার একদিন আসবেই।

এই মামলার পরবর্তী তারিখে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হবেন বলে জানা গেছে। আদালত আশা করছে, আগামী শুনানিগুলোয় মামলার পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত ন্যায়বিচারের পথ এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

আবু সাঈদের নাম আজও তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে, এক অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে। আর সেই প্রেরণার শক্তিতে দেশের মানুষ আজও চায়—বিচার হোক, ন্যায় হোক, যেন আর কোনো তরুণের রক্তে গণতন্ত্রের মাটি রাঙাতে না হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত