প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না—এমনই বার্তা দিয়েছেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। মঙ্গলবার (১০ নভেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোটের বিষয়ে সরকারের সবাই একসাথে বসে দ্রুতই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে। সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার কোনো বিষয় নেই, এটি হবে আলোচনার মাধ্যমে একটি পরিণতি।”
উপদেষ্টা জানান, সরকার শুরু থেকেই চেয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাক। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও তারা এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আছে, তারা নিজেরা যেন বসে একমত হয়। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি, এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই সরকার এবার নিজে বসবে, আলোচনা করবে, এবং যা দেশ ও জনগণের জন্য সর্বোত্তম মনে করবে সেটাই ঘোষণা করবে।”
রিজওয়ানা হাসান আরও বলেন, “সরকারের দায়িত্ব হলো অচলাবস্থা কাটানো। কেউ বলেনি যে, সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। বরং এখন সময় এসেছে, সরকার যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিষ্কার হয়। জনগণ জানতে চায়, সামনে কী হতে যাচ্ছে—সরকার সে বিষয়ে পরিষ্কার বার্তা দিতে প্রস্তুত।”
উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত কোনো পক্ষের অনুকূলে নয়; বরং সেটি হবে জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায়। তিনি বলেন, “জনপ্রত্যাশা ও রাজনৈতিক দলের চিন্তা-ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার যেটা ভালো মনে করবে, সেটাই বাস্তবায়ন করবে। কেউ বলেনি যে, সরকারের সিদ্ধান্ত মানবে না। সরকারের দায়িত্ব জনগণের প্রতি, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি নয়।”
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমরা বলেছিলাম, রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেরা বসে সমাধান করতে পারে সেটা সবচেয়ে ভালো। কিন্তু তারা যখন পারেনি, তখন সরকারের দায়িত্ব হয়ে যায় একটি সমাধান বের করা। এখন যেহেতু সাত দিন কেটে গেছে, সরকার নিজেদের মধ্যে বসে আলোচনা করবে এবং একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবে। সেই সিদ্ধান্ত খুব শিগগিরই জানিয়ে দেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, “সরকারের দরজা সবসময় খোলা ছিল, এখনও আছে। আমরা শুনিনি যে সরকার এখনই আবার সবাইকে আলোচনায় ডাকছে, তবে সরকার যখন বসবে, তখন যদি মনে করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবার সংলাপ দরকার, তখন সে সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। তবে এবারে সরকার তার অবস্থান স্পষ্ট করবে বলে আমি মনে করি।”
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা হাসান বলেন, “এখন আর কোনো ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’ নিয়ে কথা বলার সময় নয়। সরকার তার সিদ্ধান্ত নেবে, এবং সে সিদ্ধান্ত হবে স্বচ্ছ, যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তবসম্মত। কেউ যদি বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, তা সঠিক নয়। সরকারের দায়িত্ব দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং তা-ই করা হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে নানা মহল থেকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে। কেউ কেউ অপ্রয়োজনে পানি ঘোলা করতে চাইছে, কিন্তু দেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা জানে, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের পথে সুদৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু ন্যস্ত স্বার্থ হয়তো চাইছে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে, কিন্তু সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে।”
রিজওয়ানা হাসান বলেন, “যখনই কেউ অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চাইবে, সরকার তার মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকবে। প্রথমত, আমাদের চেষ্টা থাকবে কেউ যেন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে। তারপরেও যদি কেউ বিশৃঙ্খলা ছড়ায়, তাহলে সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।”
তিনি নির্বাচনকে ঘিরে প্রচলিত “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” ইস্যু নিয়েও কথা বলেন। তাঁর ভাষায়, “কেউ বলেনি, নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হচ্ছে না। কেউ যদি সুস্পষ্টভাবে কোনো অভিযোগ দেখাতে পারে, তাহলে সরকার তা খতিয়ে দেখবে। এখানে সরকারের কোনো গাফিলতি নেই। নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করতে সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি রেখেছে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, “যেভাবে সব পক্ষকে সম্পৃক্ত রেখে সরকার এগোচ্ছে, তাতে আশা করা যায়, একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে। সরকার চায় দেশের মানুষ আস্থার সঙ্গে ভোট দিক, যেন গণতন্ত্র আরও সুসংহত হয়।”
উপদেষ্টা বলেন, “নির্বাচন কোনো সংঘাতের বিষয় নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সরকার কখনোই চায় না, এই প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হোক। জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “আমরা এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সিদ্ধান্ত এমন হতে হবে, যা শুধু রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙবে না, বরং জনগণের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের এই বক্তব্য সরকারের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যে চূড়ান্ত পর্যায়ে, সেটির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনেকের ধারণা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে।
এখন দেশের রাজনৈতিক মহলে একটাই প্রশ্ন—সরকার কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? গণভোট হবে কি না, নির্বাচন কবে, এবং কীভাবে হবে—এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে পুরো জাতি তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্যে তাই একদিকে দেখা গেছে আশ্বাস, অন্যদিকে এসেছে স্পষ্ট বার্তা—সরকার সময়ক্ষেপণ করবে না। জনগণ শিগগিরই জানতে পারবে, আগামী নির্বাচনের রূপরেখা কী হবে।
এই বক্তব্যে যেমন ফুটে উঠেছে সরকারের দৃঢ় অবস্থান, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার। তিনি বলেছেন, “সরকার কারও পক্ষে দায়িত্ব পালন করে না। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার যেটা ভালো মনে করবে, সেটাই বাস্তবায়ন করবে।”
তাঁর কথায় যেন প্রতিধ্বনিত হয় এক স্পষ্ট সংকেত—দেশ গণতন্ত্রের পথে আছে, সরকারও সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে, এবং সিদ্ধান্ত আর দূরে নয়—খুব শিগগিরই সেটি জানিয়ে দেওয়া হবে।