প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সেই থেকে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। দীর্ঘ নির্বাসনের পর এবার তার বাংলাদেশে ফেরার গুঞ্জনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়।
এদিকে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণার তারিখ আগামী ১৩ নভেম্বর নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণার দিনকে ঘিরে কোনো ধরনের নৈরাজ্য বা সহিংসতা যেন না ঘটে, সে লক্ষ্যে দেশের সব থানায় বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে পাঠানো বার্তায় বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে নাশকতার চেষ্টা চালাতে পারে। তাদের উসকানিমূলক অনলাইন প্রচারণা ও গোপন সমাবেশের ওপর কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে টহল, পিকেট ও মোবাইল ইউনিটের মাধ্যমে সব সময় সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে। ঢাকায় প্রবেশপথগুলোয় বাড়ানো হয়েছে তল্লাশি ও চেকপোস্টের সংখ্যা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনের ওপর নজরদারি চালাচ্ছেন। বিশেষ করে ঢাকার আশপাশের সড়কে র্যাব ও পুলিশ টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী দেশ-বিদেশ থেকে উসকানিমূলক ভিডিও ও বার্তা ছড়াচ্ছে। তাদের কেউ কেউ “১৩ নভেম্বর হাসিনা দেশে ফিরছেন” বলে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে, যা জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই এসব কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকা করেছে সাইবার গোয়েন্দা ইউনিট।
বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কিছু প্রভাবশালী নেতাও অনলাইনে সক্রিয় রয়েছেন। পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলসহ আরও কয়েকজন প্রবাস থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাদেরও নজরদারিতে আনা হয়েছে।
রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বিজিবি ও র্যাবকে মাঠে নামানো হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, প্রয়োজনে সেনাবাহিনীও ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় মোতায়েন করা হবে। আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “দেশে কোনো ধরনের নৈরাজ্য বা সহিংসতা সহ্য করা হবে না। আমাদের সব ইউনিট প্রস্তুত রয়েছে। জনগণের জানমাল রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকবে।”
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, ঢাকায় প্রবেশপথগুলোয় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও মিরপুরের প্রবেশদ্বারগুলোয় বাড়ানো হয়েছে চেকপোস্ট। প্রতিটি গাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে, সন্দেহভাজনদের দেহ তল্লাশিও করা হচ্ছে।
এছাড়া ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত টহল দিচ্ছেন, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক জানিয়েছেন, তাদের জেলায় টহল টিম সক্রিয় করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং রাজনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ চলছে। রাজশাহী রেঞ্জের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জামিনে থাকা সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের তালিকা করে নজরদারি চালানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের পরও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছদ্মবেশে তৎপর রয়েছে। তারা হঠাৎ হঠাৎ ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে তারা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় পুলিশ সদর দপ্তর দেশের প্রতিটি জেলায় কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।
রায় ঘোষণার দিন ঢাকাসহ সারাদেশে নিরাপত্তা থাকবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। প্রতিটি থানা, জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক গতিবিধি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশজুড়ে এখন প্রশ্ন একটাই—১৩ নভেম্বর শেখ হাসিনা কি সত্যিই দেশে ফিরছেন, নাকি এটি কেবলই গুজব? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্য বলছে, তারা কোনো ঝুঁকি নিচ্ছে না। প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত।
এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। আদালতের রায়, হাসিনার সম্ভাব্য আগমন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন দৃঢ়ভাবে বলছে, “আইনের শাসন ব্যাহত হবে না, নৈরাজ্যের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।”
তবে রায়ের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনমতের চাপ। জনগণ এখন অপেক্ষায়—১৩ নভেম্বর কী ঘটে বাংলাদেশে? শেখ হাসিনা কি সত্যিই ফিরে আসছেন, নাকি এই গুজবই নতুন এক রাজনৈতিক নাটকের সূচনা? সময়ই বলে দেবে, তবে আপাতত গোটা দেশ তাকিয়ে আছে সেই দিনটির দিকে, যেদিন ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পাশাপাশি বাংলাদেশ হয়তো প্রবেশ করবে নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে।