প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে সংস্কারভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক ধারার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান জানিয়ে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, যারা সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট বা নির্বাচনী সমঝোতা সম্ভব নয়। বরং সংস্কারের পক্ষে থাকা দল ও সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে জনগণের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের আন্দোলন গড়ে তুলতে চায় এনসিপি। মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের বি বি রোডে সমবায় কমপ্লেক্স ভবনের নবম তলায় এনসিপির জেলা ও মহানগর কার্যালয়ের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিল দলীয় নেতাকর্মীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। জেলা ও মহানগর পর্যায়ের বহু তরুণ নেতা, নারী কর্মী ও পেশাজীবী সমর্থকের অংশগ্রহণে এক ধরনের উচ্ছ্বাস ও আশাবাদ ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের এই নতুন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে দলীয় কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে বলেই মত দিয়েছেন নেতারা। সেই উচ্ছ্বাসের মধ্যেই হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন এনসিপির স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান।
তিনি বলেন, “সংস্কারের পক্ষে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যারা অবস্থান নিয়েছে, তারা যদি আমাদের সঙ্গে আসতে চায়, আমরা অবশ্যই তাদের নিয়ে যৌথভাবে কাজ করতে পারি। কিন্তু যারা সংস্কারের বিপক্ষে, যারা দেশের সংস্কার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং চব্বিশের জন-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে—তাদের সঙ্গে এনসিপির কোনো জোট বা নির্বাচনী অ্যালায়েন্স কখনোই সম্ভব নয়।” তাঁর এই বক্তব্যে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দেখছেন, এটি এনসিপির আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক কৌশলের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হাসনাত আবদুল্লাহ আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অপ্রাসঙ্গিক দল। এতদিন টকশোতে বা গণমাধ্যমে কিছু ভাড়াটে সুবিধাভোগী তাদের হয়ে বৈধতা উৎপাদনের চেষ্টা করলেও গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে আবারও স্পষ্ট হয়েছে—এই দলকে বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আওয়ামী লীগ কখনোই গণমানুষের দল ছিল না। তারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, জনগণের জন্য নয়। তাই জনগণের আস্থা হারানো একটি দলের সঙ্গে সংস্কারবাদী রাজনীতি এক পথে চলতে পারে না।”
এ সময় তিনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়েও মত দেন। অতীতে যারা দেশে আগুন সন্ত্রাস চালিয়েছে, তারাই আবারও নতুন করে সেই একই কৌশলে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন হাসনাত। তিনি বলেন, “যারা অতীতে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করেছে, তারা আজও একই কাজ করছে। তারা জানে জনগণ তাদের আর চায় না, তাই অস্থিরতা সৃষ্টি করেই তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ও সুসংহত না করলে আগামী জাতীয় নির্বাচন কোনো অবস্থাতেই সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য নিরাপদ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, “এনসিপি একটি সংস্কারকামী দল। আমরা বিশ্বাস করি—রাজনীতি মানে জনগণের অংশগ্রহণ, ন্যায্যতা ও সুশাসনের নিশ্চয়তা। অতীতের মতো প্রশাসনকে ব্যবহার করে রাতের ভোটের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগ থাকবে না। আমরা চাই, জনগণের ভোটে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হোক।”
তিনি দাবি করেন, এনসিপি সাংগঠনিকভাবে ইতিমধ্যে সারা দেশে সংস্কারকেন্দ্রিক রাজনীতি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি জেলায় দলীয় কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। “আমরা চাই নতুন প্রজন্ম রাজনীতিকে মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে দেখুক। দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, সেই পরিবর্তনের বাহক হবে এনসিপি,” বলেন তিনি।
চলতি নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই সারা দেশে এনসিপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে জানান হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, “আমরা খুব শিগগিরই আমাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করব। জনগণের চাওয়া ও মাঠের বাস্তবতা বিবেচনা করেই আমরা প্রার্থী নির্ধারণ করব। এই নির্বাচনে এনসিপি নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করবে।”
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করেন, এনসিপি কোনো রাজনৈতিক শক্তির পরিপূরক নয়। বরং দলটি একটি স্বতন্ত্র সংস্কারমুখী সংগঠন হিসেবে জনগণের বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে কাজ করছে। “আমরা কাউকে বাদ দিয়ে নয়, বরং সকল গণতান্ত্রিক ও সংস্কারমুখী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই। তবে যারা সংস্কারের নামে ধ্বংসের রাজনীতি করেছে, তাদের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই আপস নয়,” বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন, কেন্দ্রীয় সংগঠক শওকত আলী, কেন্দ্রীয় সদস্য আহমেদুর রহমান তনুসহ জেলা ও মহানগর নেতারা। সবাই একবাক্যে বলেন, এনসিপি এখন একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাসনাত আবদুল্লাহর এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং এটি এনসিপির আদর্শিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। দেশে যখন রাজনৈতিক জোটবদ্ধতা ও মতাদর্শের প্রশ্নে বিভক্ততা চলছে, তখন সংস্কারমুখী ও স্বচ্ছ রাজনীতির পক্ষে এনসিপির অবস্থান নতুন বার্তা দিচ্ছে।
দেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে জনগণ পরিবর্তনের আশা করছে, সেখানে সংস্কার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও স্বচ্ছ রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ানো একটি দলের বার্তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এনসিপির এই অবস্থান আগামী নির্বাচনের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সবশেষে বলা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে এনসিপি এখন শুধু সংগঠন নয়, বরং একটি নতুন চিন্তাধারার প্রতীক হয়ে উঠছে। তাঁর কথায় স্পষ্ট—সংস্কারের রাজনীতি কোনো আপসের রাজনীতি নয়, বরং এটি জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আর সেই জনআকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে এনসিপি এগিয়ে যেতে চায় একটি স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং সংস্কারমুখী বাংলাদেশের পথে।