বগুড়ায় হত্যার ঘটনায় তিন জনের ফাঁসির রায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮ বার

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় ব্যবসায়ী ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তোজাম্মেল হক হত্যা মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ আট বছর বিচার প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক শাহজাহান কবির এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন দুর্গাহাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবুল প্রাং (২৮), মানিক মিয়া (২৮) ও মিশু (২৭)। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন পিন্টু ওরফে মাজেদুর রহমান (৪০), দেলোয়ার হোসেন দুলু (৫৮) এবং আশিক (২৮)। এর মধ্যে পিন্টু বর্তমানে কারাগারে আছেন, বাকিরা পলাতক।

অপরদিকে অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামি শাফায়াত হোসেন পাপ্পু (২৬) এবং মুন্না ওরফে তৌহিদুল ইসলাম পল্লব (২০)কে আদালত খালাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় শান্ত সাকিদার (২৯)ও খালাস পান।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে স্থানীয় আধিপত্য ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে দুর্গাহাটা ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ও ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী তোজাম্মেল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৫ সেপ্টেম্বরের সেই রাতে বাড়ি ফেরার পথে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে আসামিরা। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পরদিন নিহতের ভাই বাদী হয়ে গাবতলী থানায় মামলা করেন।

দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের পর আদালত নিশ্চিত হয় যে, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যার সকল উপাদান প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক শাহজাহান কবির তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

রায় ঘোষণার সময় শুধু পিন্টু মিয়া আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ড সমাজে গভীর বিভাজন ও ভয় তৈরি করেছে। অপরাধীদের এই সাজা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. রফিকুল ইসলাম রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেন, “এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের জন্য লড়েছি। অবশেষে আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে আমরা সন্তুষ্ট।”

অন্যদিকে, বাদী পক্ষের পরিবারের সদস্যরা রায়ের সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। নিহত তোজাম্মেল হকের বড় ভাই বলেন, “আমরা বিচার পেয়েছি, কিন্তু ভয় এখনো কাটেনি। যারা পলাতক, তারা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার না হলে আমরা নিরাপদ বোধ করছি না।”

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে আছে। পুলিশের বিশেষ টিম তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে।

গাবতলীর স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহত তোজাম্মেল হক ছিলেন এলাকায় জনপ্রিয় একজন ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তা ও সামাজিক প্রভাব কিছু প্রতিপক্ষের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় ধরে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। অনেকেই ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে মঙ্গলবারের রায় তাদের কাছে নতুন আশার আলো হিসেবে এসেছে।

স্থানীয়দের মতে, এই রায় শুধু এক ব্যক্তির হত্যার বিচার নয়, বরং একটি এলাকায় আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। তারা বিশ্বাস করেন, রায় দ্রুত কার্যকর হলে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।

মামলার রায়ে সন্তুষ্ট হয়ে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বগুড়ার এই হত্যাকাণ্ডটি স্থানীয় রাজনীতি, প্রভাব এবং প্রতিহিংসার একটি নির্মম উদাহরণ হয়ে আছে। তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রায় প্রমাণ করেছে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, অপরাধ যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, ন্যায়বিচার একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত