প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় একটি ভয়াবহ অগ্নিসংযোগে আলম এশিয়া পরিবহনের বাসের চালক জুলহাস মিয়া (৩৫) দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। সোমবার গভীর রাতে উপজেলার একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে ঘটে এই নৃশংস ঘটনা। অভিযুক্তরা বাসে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়, ফলে জুলহাস বাসের সিটে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
নিহত জুলহাস মিয়ার বাড়ি কৈয়ারচালা গ্রামে। তার মা সাজেদা বেগম জানান, ভোরে খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, “আমার বুকের টুকরোটা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তোমরা আমার ছেলেকে ফেরত দাও।” মা সাজেদা আরও জানান, জুলহাস খুব পরিশ্রমী এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। ঋণ থাকলেও তিনি হাসিমুখে সংসার চালাতেন। তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করতে যেতেন না, বলতেন, “মা, তুমি আর কাজ করো না, আমি এখনও বেঁচে আছি।”
জুলহাস মিয়া মাত্র এক বছর আগে বিয়ে করেছিলেন জাকিয়া আক্তারের সঙ্গে। কিছুদিন ধরে জাকিয়া বাবার বাড়িতেই ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ছুটে আসেন শ্বশুরবাড়িতে। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে জাকিয়া বলেন, “এক বছর হলো সংসার শুরু করেছি। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো?” পরিবার সূত্রে জানা যায়, জুলহাস মা ও স্ত্রীকে নিরাপত্তা দিতে সবসময় তাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও আর্থিক ভার বহন করতেন। তিনি নিজস্ব অর্থে একটি ঘর তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু আগুন সন্ত্রাসীদের এই নির্মমতায় তার স্বপ্ন, সংসার এবং ভবিষ্যৎ সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, জুলহাস মিয়ার মৃত্যু এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কৈয়ারচালা গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগুন সন্ত্রাসীদের এমন নৃশংসতায় ফুলবাড়িয়া ফুঁসে উঠেছে। জুলহাসের মৃত্যু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে, একজন পরিশ্রমী চালকের প্রাণ নিতে আগুনই কি এখন রাজনীতি?”
ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান জানান, রাত ২টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা আলম এশিয়া পরিবহনের বাসটি পেট্রোল পাম্পের সামনে থামানো হয়। যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পরও জুলহাস বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনজন দুর্বৃত্ত বাসে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, এটি একটি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ হতে পারে।
ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার কাজী আখতার উল আলম বলেন, “ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।” তিনি আরও জানান, স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চলবে এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
এদিকে জুলহাসের মা ও স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা মানসিক শোকে ভুগছেন। তাদের একমাত্র উপার্জনকারী সন্তান হারানোর কারণে পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, জুলহাস মিয়া সমাজে তার সততা ও পরিশ্রমের জন্য পরিচিত ছিলেন। আগুনে পুড়ে নিহত হওয়া এই নৃশংস ঘটনা পুরো এলাকার মানুষকে আহত করেছে এবং এই ধরনের সন্ত্রাসমূলক হামলা প্রতিরোধে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই ঘটনায় ফুলবাড়িয়ায় ন্যায়বিচারের দাবিতে সাধারণ মানুষও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। প্রত্যেকে চাইছেন, দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক, যাতে আর এমন অগ্নিসংযোগ এবং জীবনহানির ঘটনা না ঘটে।