প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নতুন ষড়যন্ত্রে নেমেছে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের পলাতক নেতৃত্ব। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দলটির পলাতক নেত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতের রাজধানী দিল্লিকে তাঁর প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছেন। সেখানে বসেই তিনি বাংলাদেশে সন্ত্রাস, নাশকতা ও সরকার পতনের পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। বিশেষ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা গণহত্যা মামলার সম্ভাব্য রায় ঘোষণার তারিখ ১৩ নভেম্বর ঘিরে এ ষড়যন্ত্র আরও গতি পেয়েছে। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৩৭ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
দিল্লির লুটিয়েন্স বাংলো জোনের অভিজাত এলাকায় ভারত সরকারের দেওয়া একটি সুরক্ষিত বাসভবনে এখন অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। সূত্র বলছে, এই বাসাটি এখন কার্যত একটি “ওয়ার রুম” বা যুদ্ধকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানেই নিয়মিতভাবে বৈঠক চলছে তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং কয়েকজন সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে। পুতুল, যিনি সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দায়িত্ব হারিয়েছেন, এখন সার্বক্ষণিক মায়ের সঙ্গেই রয়েছেন। জানা গেছে, বৈঠকের মূল এজেন্ডা হচ্ছে—বাংলাদেশে কীভাবে দ্রুত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বর্তমান সরকারকে বিপর্যস্ত করা যায়।
গত ৪ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মধ্যে এই পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, পুতুল মাকে আপাতত কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দিলে হাসিনা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। পুতুলের যুক্তি ছিল, নাশকতা চালালে আন্তর্জাতিকভাবে তাঁদের অবস্থান আরও দুর্বল হবে; কিন্তু হাসিনা এতে রাজি হননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, “এখনই পদক্ষেপ না নিলে সুযোগ আর আসবে না।”
এর আগে ১১ অক্টোবর শেখ হাসিনার দিল্লির বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয় একটি গোপন বৈঠক। চার ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে অংশ নেন অন্তত ১০ জন সাবেক সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক ডিজিএফআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, এবং সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, সাইমুম সরোয়ার কমল, আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু ও ছোট মনির। ওই বৈঠকেই বাংলাদেশে সমন্বিত নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় বলে সূত্রের দাবি।
বৈঠক শেষে পুতুল তাঁর মাকে প্রশ্ন করেন—যারা অতীতে ব্যর্থতা ডেকে এনেছে, সেই একই লোকদের ওপর আবার ভরসা রাখার কারণ কী? জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “ওদের দিয়েই পরিস্থিতি পাল্টাতে হবে।” এই উত্তরে মায়ের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন পুতুল।
অন্য এক সূত্র জানিয়েছে, হাসিনার সাবেক সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবির আহমেদ সম্প্রতি শেখ হাসিনার নির্দেশে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় তাঁর নাম প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় তিনি গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ছিলেন।
এদিকে, ১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য পলাতক নেতারা অনলাইনে একাধিক বৈঠক করেছেন। শুক্রবার রাতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা জেলা কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিং করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ও যুবলীগের সাবেক নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়—প্রত্যেক উপজেলা থেকে অন্তত ২০০ জন করে নেতাকর্মীকে ঢাকায় জড়ো করতে হবে। ইতিমধ্যে কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার, ধামরাই, দোহার, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের এলাকায় তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে অর্থসংস্থান নিয়ে পলাতক নেতাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে তহবিল দিতে নারাজ। তাঁদের দাবি, যারা বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী রাজনীতির ছায়ায় থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন, তাদের থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা উচিত। আলোচনায় উঠে আসে, শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সিকদার গ্রুপ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ইতোমধ্যে প্রায় ছয় কোটি টাকা দিয়েছে। কিন্তু ঢাকায় যারা ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামছে, তাদের মাত্র দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে—যা নিয়ে基层 নেতাদের ক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছে।
নাশকতার পদ্ধতি নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—নেতাকর্মীরা যেন সরাসরি সংঘর্ষে না জড়ায়, বরং হঠাৎ করে ককটেল বা বোমা হামলার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এরই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাতে কাকরাইলের একটি চার্চের সামনে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্যমতে, এটি ছিল “জনমনে ভীতি ছড়ানোর কৌশল”। আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীজুড়ে এ ধরনের ছোট ছোট হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। দিল্লিতে বসেই তিনি ঢাকায় আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তাঁকে সহায়তা করছেন পলাতক পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, এসএসএফের সাবেক ডিজি লে. জেনারেল (অব.) মুজিবুর রহমান এবং আকবর হোসেন। এই দলটি সমন্বয় করে কাজ করছে পলাতক সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি লিয়াকত শিকদার, জাহাঙ্গীর আলম ও ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের সঙ্গে। টার্গেট করা হয়েছে আদালতপাড়া, সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় নভেম্বরের মধ্যে ঘোষণা করা হলে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর এলাকায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরির পরিকল্পনাও আছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে সেনা মোতায়েন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যাতে পরিস্থিতি উত্তেজিত না হয়।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে নাশকতার এসব পরিকল্পনা ঠেকাতে ইতোমধ্যে বড় অভিযান শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীসহ আশপাশের জেলায় ব্যাপক অভিযান চালিয়ে ৩৭ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, “পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী যদি দেশে আবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, জনগণই তাদের প্রতিরোধ করবে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে তারা পালিয়ে গেছে—এখন দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।”
বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা—নতুন ষড়যন্ত্র, অস্থিরতা বা সহিংসতার কোনো ছায়া যেন আর এ দেশের মাটিতে না পড়ে। এখন সময় ঐক্যের, সময় ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার।