তেঁতুলিয়ায় কনকনে শীতের আগমন: ১২.৮ ডিগ্রিতে কাঁপছে উত্তরাঞ্চল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
তেঁতুলিয়ায় কনকনে শীতের আগমন: ১২.৮ ডিগ্রিতে কাঁপছে উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে শীতের আগমনী বার্তা যখন ধীরে ধীরে অনুভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া যেন প্রথম দিকেই শীতের আলিঙ্গনে কেঁপে উঠেছে। বুধবার সকাল ৬টায় তেঁতুলিয়ার তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে—যা এ মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। সকাল থেকে হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশায় মোড়া চারপাশ যেন জানান দিচ্ছে—বাংলাদেশে এবার শীত এসেছে বেশ আগেভাগেই।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, তেঁতুলিয়ার বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯৯ শতাংশ। ফলে বাতাসে ছিল শীতের ঠান্ডা ছোঁয়া, আর আকাশে ছিল মেঘের পর্দা। স্থানীয়রা বলছেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে ভোর ও সন্ধ্যায় কুয়াশা বেড়েছে, এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে কনকনে ঠান্ডা।

পঞ্চগড়ের মানুষ বরাবরই দেশের প্রথম শীতপ্রবাহের সাক্ষী হন। কিন্তু এবারের ঠান্ডা যেন একটু বেশি অনুভূত হচ্ছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের বাতাস বইতে শুরু করে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও শীতল হয়ে ওঠে। সকালে সূর্যের দেখা মিললেও তার তেজ যেন উষ্ণতা ছড়াতে পারছে না। মাঠে কাজ করা কৃষকরা মোটা চাদর গায়ে জড়িয়ে দিন শুরু করছেন, শিশুরা ঘরে আগুন জ্বালিয়ে বসছে উনুনের পাশে।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানিয়েছেন, একদিনের ব্যবধানে এখানকার তাপমাত্রা ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি, যা আজ নেমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৮-এ। তিনি বলেন, “গত কয়েকদিন থেকেই তাপমাত্রা ক্রমশ কমছে। নভেম্বর মাসের শেষের দিকে আরও শীত পড়ার সম্ভাবনা আছে। এটা মূলত মৌসুমি হাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব, পাশাপাশি হিমালয় থেকে নেমে আসা ঠান্ডা বাতাসের কারণেও তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা দ্রুত কমছে।”

এদিকে, তাপমাত্রা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে জেলার জীবনযাত্রায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে সড়ক, দৃশ্যমানতা কমে যাচ্ছে অনেকটাই। রিকশা ও ভ্যানচালকরা এখন লণ্ঠন বা ব্যাটারি লাইটের সাহায্যে চলাচল করছেন। সকালে কর্মজীবী মানুষ ঘর থেকে বের হতে দেরি করছেন, আবার চায়ের দোকানে ভিড় বেড়েছে কয়েকগুণ।

শীতের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। তেঁতুলিয়া শহরের লেপ-তোশক তৈরির দোকানগুলোতে এখন ভিড় লেগে আছে। দোকানিরা জানাচ্ছেন, গত তিন দিনে বিক্রি বেড়েছে আগের চেয়ে দ্বিগুণ। কেউ পুরোনো লেপ নতুন তুলায় ভর্তি করাচ্ছেন, কেউবা নতুন কম্বল কিনছেন পরিবারের সদস্যদের জন্য। একইভাবে গরম পোশাকের দোকানগুলোতেও জমে উঠেছে বেচাকেনা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সোয়েটার, মাফলার, উলেন টুপি ও জ্যাকেটের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ।

তবে শীতের আনন্দের সঙ্গে এসেছে কিছু দুঃসংবাদও। ঠান্ডা-জনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে, বিশেষ করে শিশুরা। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে শ্বাসকষ্ট, সর্দি, জ্বর ও ডায়রিয়াজনিত রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শিশু ও বৃদ্ধদের ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে উষ্ণ কাপড় ব্যবহার ও যথাযথ যত্ন নেওয়ার।

তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. নুরুল হক বলেন, “হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসজনিত রোগ বাড়ছে। আমরা সাধারণ মানুষকে পরামর্শ দিচ্ছি—বিশেষ করে ভোরে বা রাতে বাইরে বের হলে যেন গরম কাপড় ব্যবহার করে। এছাড়া রোগীরা যেন সর্দি বা জ্বরের প্রাথমিক উপসর্গ দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।”

এদিকে, শীত নামার সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চগড়ের গ্রামীণ জীবনে এসেছে উৎসবের আবহও। ইতোমধ্যে শীতের পিঠাপুলির ধুম পড়েছে। রাস্তার পাশে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধ-চালের পায়েসের দোকানগুলোতে ভিড় করছে স্থানীয় মানুষজন। গ্রামীণ নারীরা ব্যস্ত ভোরবেলা থেকে পিঠা তৈরির প্রস্তুতিতে। এমনকি স্কুল শেষে শিশুরাও দল বেঁধে যাচ্ছে দোকানে পিঠার স্বাদ নিতে।

শহরের এক স্থানীয় দোকানি রহিম উদ্দিন বলেন, “শীত মানেই পিঠার মৌসুম। ঠান্ডা পড়তে না পড়তেই বিকেলে দোকানে জায়গা পাওয়া মুশকিল। সবাই গরম পিঠা খেতে আসে, চা খেতে আসে।”

কৃষকদের জন্য এই ঠান্ডা আবহাওয়া যেমন কিছুটা কষ্টদায়ক, তেমনি তাদের শস্যের জন্য আশীর্বাদও বটে। ধান কাটা প্রায় শেষ, এখন চলছে আলু, গম, ও সরিষা চাষের প্রস্তুতি। কৃষকরা বলছেন, তেঁতুলিয়ার মাটি ও আবহাওয়া এবার আলু চাষের জন্য বেশ অনুকূল হতে পারে।

পঞ্চগড়ের বালাপাড়া এলাকার কৃষক আজিজুল হক বলেন, “গত বছর ঠান্ডা একটু কম ছিল। এবার হাওয়া অনেক ঠান্ডা, মনে হয় আলু ভালো হবে। শুধু ভোরে শিশির একটু বেশি পড়ছে, সেইটা সামলাতে পারলেই ভালো ফলন আশা করছি।”

তেঁতুলিয়া সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে হিমালয় থেকে নেমে আসা বাতাসের প্রভাব সরাসরি পড়ে। প্রতি বছর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এখানেই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। শীতকালে তেঁতুলিয়া পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় জায়গায় পরিণত হয়। অনেকে বরফের ছোঁয়া পেতে বা কুয়াশার মায়া দেখতে ভোরে ছুটে আসেন এই সীমান্ত শহরে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরাও ইতিমধ্যে নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তাপমাত্রা আরও কমে গেলে শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক মো. শাহীন ইমরান বলেন, “প্রতি বছর আমরা শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহায় মানুষদের মাঝে কম্বল ও গরম কাপড় বিতরণ করি। এবারও সেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।”

সব মিলিয়ে, দেশের সর্ব উত্তরের এই জনপদে শীত এখন পুরোপুরি ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আকাশে ঝুলছে ঘন কুয়াশা, বাতাসে শীতের কাঁপুনি। তেঁতুলিয়ার মানুষ জানেন, এই শীতই তাদের বছরের এক ভিন্ন আনন্দ, এক ভিন্ন ছোঁয়া। শীতের কনকনে সকালে যখন চুলার ধোঁয়া মিশে যায় কুয়াশার সাথে, তখন এই সীমান্ত শহর যেন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত চিত্রপট—যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের সহাবস্থান এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে মিশে যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত