প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ দশমিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বুধবার সকালে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বৈদেশিক লেনদেন ও আমদানি ব্যয় সামলাতে রিজার্ভের এই পরিমাণ এখনো স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভ বা মোট রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি—বিপিএম-৬ অনুযায়ী এই রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা কম, ২৬,৩৯৫ দশমিক ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৬.৪ বিলিয়ন ডলার।
এর আগের দিন অর্থাৎ ৯ নভেম্বর পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩১.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা থেকে একদিনের ব্যবধানে সামান্য হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি স্বাভাবিক পরিবর্তন, কারণ প্রতিদিনই আমদানি ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের প্রভাবে রিজার্ভের পরিমাণ ওঠানামা করে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত এক বছরের তুলনায় কিছুটা চাপে থাকলেও তা এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। মূলত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, জ্বালানি আমদানি, এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয় বাড়ার ফলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রিজার্ভের পরিমাণের হিসাব নির্ধারণে এখন থেকে সম্পূর্ণভাবে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায়, যেমন—রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ), বৈদেশিক মুদ্রা আমানত এবং কিছু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বিয়োগ করা হয়। ফলে ‘গ্রস রিজার্ভ’ ও ‘নিট রিজার্ভ’-এর মধ্যে একটি পার্থক্য তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থার পরিবেশ তৈরি করছে। কারণ, আইএমএফের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ এখন নিয়মিতভাবে রিজার্ভ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর ভিত্তিতে আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এটি বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে।
গত কয়েক বছরে রিজার্ভের উত্থান-পতন দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ২০২১ সালে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছিল, যা দেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানি মূল্যের বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে সেই রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। বর্তমানে তা ৩১ বিলিয়নের ঘরে নেমে এলেও অনেক অর্থনীতিবিদ এটিকে ‘স্থিতিশীল কিন্তু সতর্ক’ পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, রিজার্ভের এই অবস্থান খুব খারাপ নয়, তবে এটা উন্নতিরও দাবি রাখে। সরকারের উচিত রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যাল ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাতে বৈদেশিক আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা এখনো বেশি। তাই প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ধরে রাখতে বৈধ চ্যানেলে প্রেরণের সুবিধা এবং ইনসেনটিভ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থা আরও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় এখন সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আমদানি ব্যয় মেটানো এবং আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পর্যাপ্ত মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। ব্যাংকটি বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো যায় এবং ডলার সংরক্ষণে সহায়তা মেলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বাংলাদেশ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতেও রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। এই দুই উৎস রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, চলতি মাসেই আইএমএফের দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় ৬৮ কোটি ডলার সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। সেই অর্থ যুক্ত হলে রিজার্ভে আরও কিছুটা স্বস্তি আসবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে ডলার সরবরাহ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, রিজার্ভ মানে শুধু সংখ্যাগত মজুত নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতিফলন। রিজার্ভ বাড়াতে হলে শুধু বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি নয়, বরং আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে, তাই রিজার্ভের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যদিও এর পরিমাণ অতীতের তুলনায় কমেছে, তবুও সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন এটি রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ডলারবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক, এবং রপ্তানি আয়ও ধীরে ধীরে বাড়ছে—যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী মাসগুলোতে রিজার্ভ যদি ৩০ বিলিয়নের ওপরে বজায় থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ঋণগ্রহণ সক্ষমতা এবং আমদানি ব্যয়ের কাভারেজ নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকবে না। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে স্থিতিশীল রিজার্ভ ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কৌশল ও দায়িত্বশীল আর্থিক নীতি বাস্তবায়ন।
এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে, অন্যদিকে তেমনি সুযোগও তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার এই রিজার্ভই এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভরসা, যা সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে পারে।