প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সিচুয়ান প্রদেশে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে—চীন-তিব্বত সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতু হংকি ব্রিজ হঠাৎ ধসে পড়েছে। সেতুটি উদ্বোধনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এমন বিপর্যয় ঘটায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগের ঝড়। মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) বিকেলে সেতুটি ধসে পড়লে পুরো অঞ্চলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যদিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এতে কেউ হতাহত হয়নি।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের বরাত দিয়ে জানা যায়, সিচুয়ানের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত হংকি সেতুটি ধসে পড়ার আগে থেকেই ঝুঁকির মুখে ছিল। সোমবার (১১ নভেম্বর) দুপুরের দিকে স্থানীয়রা সেতুতে ফাটল দেখতে পান। একই সঙ্গে সেতুর সংলগ্ন পাহাড়ের মাটি সরতে শুরু করে, যা স্পষ্ট করে দেয় আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত। দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রশাসন সেদিনই সেতুর ওপর সবধরনের যান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে।
কর্তৃপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুরে পাহাড়ি ঢাল আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং পরপর কয়েক দফা ভূমিধসের ঘটনাই সেতুটি ধসে পড়ার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আগের দিনই ঝুঁকি শনাক্ত করেছিলাম, তাই আগেভাগেই সেতুটি বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে প্রাণহানি এড়ানো গেছে।”
হংকি সেতুটি চীনের সিচুয়ান প্রদেশের ইয়ান শহরকে তিব্বতের চামদো অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য নির্মিত হয়েছিল। সেতুটি কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটি তিব্বতের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডের পরিবহন সংযোগ আরও মজবুত করার একটি বড় প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।
মাত্র কয়েক মাস আগে, চলতি বছরের শুরুর দিকে, সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ এই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। উদ্বোধনের সময় একে ‘চীনের আধুনিক প্রকৌশলের নতুন নিদর্শন’ বলে অভিহিত করেছিল স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ৭৫৮ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি উচ্চভূমির দুর্গম এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল, যা দিয়ে প্রতিদিন শতাধিক যানবাহন চলাচল করত।
কিন্তু উদ্বোধনের এত অল্প সময়ের মধ্যেই সেতুটি ধসে পড়ায় দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণ মান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। স্থানীয় নাগরিক ও অনলাইন ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এত অল্প সময়ে একটি সেতুর ধসে পড়া কেবল প্রাকৃতিক কারণ নয়, বরং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ও তদারকির ঘাটতির ফল।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “যেখানে কোটি কোটি ইউয়ান ব্যয়ে সেতু নির্মাণ হয়, সেখানে কয়েক মাসেই সেটি ধসে পড়া লজ্জাজনক। এটা শুধু প্রকৌশল ব্যর্থতা নয়, এটা মানবিক অবহেলা।” অন্য এক মন্তব্যে বলা হয়েছে, “প্রকল্প উদ্বোধনের সময় বড় বড় বক্তব্য দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে নিরাপত্তা মান বজায় রাখা হয় না।”
অন্যদিকে, সরকারি পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত সেতু ধসের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়নি, তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভূমিধস এবং পাহাড়ি মাটি সরে যাওয়ার কারণে ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের একজন মুখপাত্র বলেন, “আমরা সেতুর ধসের সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধান করছি। প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে সেতুর স্থিতি নষ্ট হয়েছিল।”
সিচুয়ান প্রদেশটি বরাবরই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে ভূমিকম্প, ভূমিধস ও ভারী বৃষ্টিপাত নিয়মিতভাবে ঘটে থাকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, হংকি সেতুর ধস কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নয়, বরং প্রকৌশলগত ত্রুটির ফল হতে পারে। বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চেন লেই এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “চীনের সাম্প্রতিক কিছু অবকাঠামো প্রকল্পে দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার প্রবণতা দেখা গেছে। কিন্তু এতে নির্মাণ মান অনেক সময় উপেক্ষিত হয়, যার ফল এই ধরনের দুর্ঘটনা।”
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যর্থতার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালে গুয়াংসি প্রদেশে একটি এক্সপ্রেসওয়ে সেতু ধসে পড়েছিল, যাতে অন্তত ১২ জন নিহত হন। সেদিক থেকে হংকি সেতুর এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি না হওয়া কিছুটা স্বস্তির হলেও এটি আবারও প্রশ্ন তুলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
অন্যদিকে, সিচুয়ান প্রদেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এখন ধসে পড়া সেতুর ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি বিকল্প সড়ক ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে যাতে এলাকাবাসীর যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত না হয়।
চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হংকি সেতুর ধসের ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছে। দলটি নির্মাণ প্রক্রিয়া, ব্যবহৃত সামগ্রী, প্রকৌশল তদারকি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করবে।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। কারণ চীন দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো নির্মাণে তার দক্ষতা প্রদর্শন করে আসছে—বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায়। এমন এক সময়ে একটি নতুন সেতুর ধস তাদের প্রকৌশল মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা উদ্বোধনের সময় গর্বিত ছিলাম, ভাবছিলাম আমাদের এলাকা উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন ভয় লাগছে—যে সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন স্কুল, অফিসে যেতাম, তা যদি কয়েক মাসেই ধসে পড়ে, তাহলে আমরা আর কীভাবে বিশ্বাস রাখব?”
চীনের প্রকৌশল জগতে হংকি সেতুর ধস এখন এক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শুধু একটি অবকাঠামোর পতন নয়, বরং দায়বদ্ধতা, গুণগত মান এবং প্রকৌশল সততার এক বাস্তব পরীক্ষা। এখন পুরো দেশ তাকিয়ে আছে তদন্তের ফলাফলের দিকে—যা হয়তো চীনের ভবিষ্যৎ নির্মাণ নীতির দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।