প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের তরুণরা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকা রাখতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) পরিচালিত এক জরিপে জানা গেছে, দেশের ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তরুণ প্রজন্মের এই সক্রিয়তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চিত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে বিওয়াইএলসির প্রধান কার্যালয়ে ‘ইয়ুথ ম্যাটারস সার্ভে–২০২৫’ শীর্ষক জরিপের ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক, গবেষক, তরুণ প্রতিনিধিসহ গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিনিধি।
জরিপে দেখা যায়, তরুণদের ভোটদানের আগ্রহ বিপুল হলেও তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আস্থার জায়গায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ ভোট দিতে চাইলেও, তারা রাজনৈতিক দল বেছে নিতে বিভক্ত। জরিপ অনুযায়ী, ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ তরুণ বিএনপিকে ভোট দিতে চান, ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ অন্য একটি নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিকে ভোট দিতে চান। তবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চান ৯ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণ।
বিওয়াইএলসির জরিপে আরও দেখা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অংশ নিলে তরুণদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেবে। ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ বলেছেন, তারা নির্বাচনে ভোট দেবেন না, আর ৪৩ শতাংশ বলেছেন, তারা তবুও ভোট দেবেন। এই অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থক তরুণদের একাংশের অবস্থান পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। তাদের মধ্যে ২০ শতাংশ এখন বিএনপিকে ভোট দিতে চায়, আর ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ জামায়াতকে। এনসিপিকে ভোট দিতে আগ্রহী তরুণদের হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিওয়াইএলসি জানায়, এই জরিপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রায় ১০ হাজার তরুণ অংশগ্রহণ করেছেন। জরিপটি পরিচালিত হয় গত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালে।
তরুণদের ভোটদানের আগ্রহের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রতি তাদের আস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে জরিপে। জরিপ অনুযায়ী, ৪৯ শতাংশ তরুণ সরকারের প্রতি এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, ৩৮ শতাংশ তরুণের মতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া কিছুটা উন্নত হয়েছে, তবে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য বলা যায় না।
এই জরিপে তরুণদের তথ্য সংগ্রহের উৎস নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়। দেশের ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তথ্য ও খবর সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে ১৯ শতাংশ তরুণ এখনো টেলিভিশনকে প্রধান তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন। মাত্র ৮ শতাংশ তরুণ সংবাদপত্র ও রেডিওর মতো প্রচলিত মাধ্যমে নির্ভর করেন।
বিওয়াইএলসির নির্বাহী পরিচালক অনুষ্ঠানে বলেন, “বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন তথ্যসমৃদ্ধ, সংযুক্ত এবং সামাজিকভাবে সচেতন। তারা শুধু ভোট দিতে চায় না, বরং চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্য সুযোগ। এই মানসিক পরিবর্তন দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে।”
জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের অনেকে বলেছেন, তাদের ভোটদানের ইচ্ছা থাকলেও বাস্তব জীবনে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নির্বাচনকালীন সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা চাই আমাদের ভোটের মূল্য থাকুক। যদি নির্বাচন স্বচ্ছ না হয়, তবে সেই অংশগ্রহণ অর্থহীন হয়ে যায়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণদের ভোটের হার যদি বাস্তব নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়, তবে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ বর্তমানে দেশের মোট ভোটারদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এই শ্রেণির ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক দলবদল এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এনসিপির প্রতি তরুণদের আগ্রহ সেটিই ইঙ্গিত করে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়ছে।
বিওয়াইএলসি জানায়, এই জরিপের উদ্দেশ্য শুধু নির্বাচনী প্রবণতা বোঝা নয়, বরং তরুণদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। সংস্থাটি মনে করে, তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ ও রাজনৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হলে সরকার, রাজনৈতিক দল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
গবেষণাটিতে আরও উঠে এসেছে, তরুণদের বড় একটি অংশ দেশের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক সহিংসতা তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও তারা দেশের উন্নয়নে নিজেদের ভূমিকা রাখতে চায় এবং ভোটকেই পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায়।
এই জরিপ ফলাফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। অনেকে লিখেছেন, “আমরা পরিবর্তন চাই, কিন্তু সেটা হবে গণতান্ত্রিক পথেই।” অন্যরা বলেছেন, “রাজনীতির প্রতি আস্থা হারালেও ভোটের অধিকার হারাতে চাই না।”
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের এই নতুন মনোভাব ও অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেশের গণতন্ত্রকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।