প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানী ঢাকার মিরপুরের পশ্চিম মণিপুর এলাকায় সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়কে হাতিয়ার করে এক পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে। রোববার (৬ জুলাই) গভীর রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় ভুক্তভোগী সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি এবং তার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ এবং র্যাব যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজির সাথে জড়িত ছাত্রদল ও যুবদলের চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে।
ভুক্তভোগী সিরাজুল ইসলাম, যিনি এক সময় শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, জানান, রাত ১০টার দিকে হঠাৎ তার বাসায় ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল অনুপ্রবেশ করে। তাদের অধিকাংশই নিজেদের ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী পরিচয় দেয় এবং সরাসরি সিরাজুলকে হুমকি দিয়ে বলে— “তুই আওয়ামী লীগ করিস, তুই ফ্যাসিস্টদের লোক। তোকে পুলিশে ধরিয়ে দেব, বাঁচতে হলে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে।”
এই ভয়াবহ হুমকির পর তারা রাতভর সিরাজুল এবং তার পরিবারের সদস্যদের উপর ভয়ভীতি ও মানসিক নির্যাতন চালায়। পরিস্থিতির চরম উত্তেজনার মধ্যে সিরাজুল এবং তার স্ত্রী প্রাণভয়ে কাকুতি-মিনতি শুরু করেন এবং কিছু অর্থ প্রদানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেন।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে তারা হাতে থাকা ২০ হাজার টাকা দিয়ে দেয়। এরপর উপরের ফ্লাটের একজনের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার করে তা তুলে দেন অভিযুক্তদের হাতে। এরপর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের এবং সন্তানদের কাছ থেকে আরও দেড় লাখ টাকা সংগ্রহ করে তারা দেন চাঁদাবাজদের। সবমিলিয়ে পাঁচ লাখ টাকা আদায় করার পর অভিযুক্তরা বাসা ত্যাগের প্রস্তুতি নিলে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ এবং র্যাব ঘটনাস্থলে হাজির হয় এবং অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মিরপুর থানা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আতিকুর রহমান মিন্টু (৩৫), যুগ্ম আহ্বায়ক তাবিত আহমেদ আনোয়ার ওরফে আনোয়ার হোসেন তাবিত (৩৫), যুবদলের কর্মী মো. রতন মিয়া (৩৪), এবং ছাত্রদলের কর্মী মো. ইসমাইল হোসেন (২৪)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ১৬ হাজার টাকা এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রটির বাকি সদস্যরা টাকা নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ঘটনার বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাদ রোমন জানিয়েছেন, ঘটনার রাতে পুলিশে ফোন পেয়ে দ্রুত একটি দল পাঠানো হয় এবং র্যাবকেও জানানো হয়। দুই বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে চারজন গ্রেপ্তার হয়। পরদিন সোমবার ভুক্তভোগী সিরাজুলের স্ত্রী জাহানারা ইসলাম মিরপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, যাতে গ্রেপ্তার চারজন ছাড়াও অজ্ঞাত আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে আরও জানা যায়, চাঁদাবাজরা শুধু হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং পরিবারের সদস্যদের বন্দি রেখে বারবার চাপে ফেলে অর্থ আদায় করেছে এবং অর্থ না দিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। এমনকি তারা সিরাজুলের রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে তাকে ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট’ বলে আক্রমণ করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে ভয়ঙ্কর পরিণতির ইঙ্গিত দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটি তদন্তাধীন এবং বাকি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিরাপরাধ সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের চাঁদাবাজির ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগজনক।
এই ঘটনাটি শুধু একটি চাঁদাবাজির চিত্র নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের ভয়াল রূপ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও, ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।