প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছেন, প্রধান উপদেষ্টা তাঁর সাম্প্রতিক ভাষণের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ লঙ্ঘন করেছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের পরপরই এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ নতুন ধারণা। ঐকমত্য কমিশনে এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। জুলাই সনদের চেতনার সঙ্গে এই উদ্যোগ সাংঘর্ষিক।” তাঁর মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা সনদের মূল নীতি ও উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছেন, যা জনগণের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির অবমাননা।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আদেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, সনদের সংবিধান বিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবনার ওপর গণভোট আয়োজন এবং পরবর্তীতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “গণভোটে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হয়, তাহলে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যারা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।”
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচনে পাওয়া ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত বহাল থাকবে।
ভাষণে তিনি আরও ঘোষণা দেন যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তাঁর মতে, এটি হবে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, যেখানে জনগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবেন কোন পথে দেশ এগোবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিএনপিও শুরু থেকেই নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে গণভোট সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছিল। তাদের যুক্তি, জনগণের মতামত ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া হবে একটি তাড়াহুড়োপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, জুলাই সনদ হলো জনগণের চুক্তি। এটি কোনো সরকারের নয়, কোনো ব্যক্তিরও নয়। প্রধান উপদেষ্টা এই সনদের নীতিগুলো থেকে সরে গেলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে।” তিনি আরও দাবি করেন, “ঐকমত্য কমিশনে যে সিদ্ধান্তগুলো হয়েছিল, তার কোথাও সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা উল্লেখ ছিল না। প্রধান উপদেষ্টা নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা সনদের নীতির পরিপন্থী।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। বিএনপি যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে গণভোটের দিন ঘোষণা দাবি করেছিল, সেখানে প্রধান উপদেষ্টার প্রস্তাব সেই প্রত্যাশার সঙ্গে আংশিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, গণভোটের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের অবস্থানও ভিন্ন। একদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দাবি করছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন মহল ও কিছু নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মনে করছেন, প্রধান উপদেষ্টার উদ্যোগটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান।
দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রশ্নে আগামী কয়েকদিনেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তবে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ও সালাহউদ্দিন আহমদের প্রতিক্রিয়া—দুই মেরুর এই বক্তব্য এখন দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।