মানিকগঞ্জে স্কুলবাসে আগুন, দগ্ধ ঘুমন্ত চালক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ বার
মানিকগঞ্জে স্কুলবাসে আগুন, দগ্ধ ঘুমন্ত চালক

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার শান্ত নির্জন রাতটি হঠাৎই আতঙ্কে ভরে ওঠে যখন দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে একটি স্কুলবাস। গভীর রাতের অন্ধকারে, যখন সড়ক প্রায় নিশ্চুপ, তখনই ঘটে যায় এই ভয়াবহ ঘটনা। আগুনের শিখায় দগ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন বাসচালক তাবেজ খান, যিনি তখন বাসের ভেতরেই ঘুমিয়ে ছিলেন। একটি স্কুলের শিক্ষার্থীবাহী বাস এমনভাবে টার্গেট হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে। শিবালয়ের ফলসাটিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘হলি চাইল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এর শিক্ষার্থী পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত বাসটি প্রতিদিনের মতো ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে পার্কিং করে রাখা ছিল। রাতের নীরবতা ভেঙে বাসটির দিকে এগিয়ে আসে কয়েকজন দুর্বৃত্ত। স্থানীয়দের ধারণা, পরিকল্পিতভাবেই তারা বাসটির জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভেতর থেকে কোনো প্রতিরোধ আসেনি, কারণ সেই সময় বাসচালক তাবেজ খান গভীর ঘুমে ছিলেন।

আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যেই বাসের ভেতরে ধোঁয়া ও তাপ ছড়িয়ে পড়ে। তাবেজ খান আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন, কিন্তু ততক্ষণে আগুনের ভয়াবহতা বাড়তে থাকে দ্রুত। জ্বলন্ত আগুনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসার জন্য মরিয়া চেষ্টা করেন তিনি। বাইরে থেকে কেউ প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী ঘটছে, কারণ চারদিকে অন্ধকার এবং মানুষের চলাচল খুবই কম। আগুনের শিখা বড় হতে শুরু করলে দূরে থাকা কয়েকজন পথচারী বিষয়টি টের পায় এবং চিৎকার করে স্থানীয়দের খবর দেয়। তারা দ্রুত উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেও আগুনের তীব্রতার কারণে কেউ কাছে যেতে পারেনি।

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিবালয় থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। উপপরিদর্শক সুমন চক্রবর্তী জানান, তারা এসে দেখতে পান বাসটি পুরোপুরি জ্বলছে এবং ভেতরে একজন আটকা পড়ে আছে বলে সন্দেহ হয়। ঝুঁকি নিয়েই পুলিশ সদস্যরা জানালা ভেঙে ভেতর থেকে তাবেজ খানকে বের করে আনেন। তাকে দ্রুত প্রথমে মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এখন তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন, এবং চিকিৎসকদের মতে, তার শারীরিক অবস্থা শঙ্কামুক্ত নয়।

তাবেজ খান মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বাড়ইবিকুরা গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যরা ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিভিন্ন ছোটখাটো ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর তদন্ত এগোয় না। তারা আশঙ্কা করছেন, এটি হয়তো কোনো পরিকল্পিত নাশকতার অংশ হতে পারে। তবে পুলিশ এখনই এমন কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চায়নি। পুলিশ বলছে, এখনো তদন্তের প্রাথমিক ধাপে রয়েছে তারা। তবে ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাসটিতে আগুন দেয়ার কারণ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অনেকেই মনে করছেন, বাসটির পার্কিং জায়গা পরিবর্তন বা নিরাপত্তা জোরদার করা উচিত ছিল। অন্যদিকে কিছু বাসচালক জানিয়েছেন, রাতে বাসের ভেতরে ঘুমানো অনেকটাই বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, কারণ ভাড়া করা নিরাপদ জায়গায় বাস রাখার সুযোগ থাকে না সবসময়। তাই তারা বাধ্য হয়েই সড়কের পাশে পার্কিং করে বাসের ভেতরেই রাত কাটান। এতে যে কতটা ঝুঁকি থাকে, তা এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করল।

ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করে প্রায় আধা ঘণ্টা। তাদের ধারণা, আগুনটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কারণ বাসের ভেতরে সিটের ফোম, প্লাস্টিকের অংশ এবং তেলের উপস্থিতি আগুনকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। আগুন নেভানোর পর দেখা যায়, বাসটি প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘটনার পর সকাল থেকে এলাকাবাসী ভিড় করছেন ঘটনাস্থলে। সবাই হতবাক হয়ে দেখছেন স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের যাতায়াতে ব্যবহৃত বাসটির ধ্বংসস্তূপ।

‘হলি চাইল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এর শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে একই রুটে শিক্ষার্থীদের আনাগোনার জন্য বাসটি ব্যবহার করতেন। চালক তাবেজ খানও তাদের কাছে পরিচিত এবং দায়িত্বশীল একজন মানুষ ছিলেন। তার এমন করুণ পরিণতি সবাইকে শোকাহত করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা পুলিশের তদন্তে সহযোগিতা করবে এবং ভবিষ্যতে বাসগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার চেষ্টা করা হবে।

এদিকে, শিবালয় থানার এসআই সুমন চক্রবর্তী বলেছেন, ঘটনাস্থল থেকে কিছু প্রাথমিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এটি পরিকল্পিত নাশকতা নাকি স্থানীয় কোনো বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনই নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তবে সব ধরনের সম্ভাবনাই তারা খতিয়ে দেখছেন। তিনি আরও বলেন, স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দূর করতেই কয়েদিনের মধ্যেই এ ঘটনার রহস্য উৎঘাটনে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মানিকগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যা স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে। এই আগুনের ঘটনাটি বিশেষভাবে ভয়াবহ, কারণ এতে একজন সাধারণ পরিশ্রমী মানুষ জীবনের ঝুঁকিতে পড়েছেন। তার পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তাহীনতার যে ছায়া নেমে আসছে, তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে নানা মহলে।

এই ঘটনার পর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, মহাসড়কের পাশে রাতের বেলায় টহল বাড়ানো উচিত। পার্কিং করা বাসগুলো যাতে নিরাপদে রাখা যায়, সেজন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দের দাবিও তুলেছেন তারা। আগুনের ভয়াবহতা এবং অসহায়ভাবে পড়ে থাকা চালকের অবস্থা যারা দেখেছেন, তারা আজও ঘটনাটি স্মরণ করে শিউরে উঠছেন।

রাতের অন্ধকারে আগুনের লেলিহান শিখা শুধু বাসটাই পুড়িয়ে দেয়নি, সঙ্গে পুড়িয়ে দিয়েছে এক চালকের জীবনের নিশ্চিন্ততা, আর একটি পরিবারের স্বপ্ন। পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং দগ্ধ চালকের সুস্থতায় এখন তাকিয়ে রয়েছে পুরো এলাকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত