ড্রামে মিলল ব্যবসায়ীর খণ্ডিত দেহ, রাজধানীতে চাঞ্চল্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৯ বার
ড্রামে মিলল ব্যবসায়ীর খণ্ডিত দেহ, রাজধানীতে চাঞ্চল্য

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবন যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। হাইকোর্ট এলাকার কাছে দু’টি নীল রঙের প্লাস্টিক ড্রামের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় এক ব্যক্তির খণ্ডিত মরদেহ। চারপাশে গা শিউরে ওঠা বাতাস আর মানুষের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। পরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায়, নিহত ব্যক্তি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আশরাফুল হক।

মরদেহ উদ্ধারের আগেই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল দুপুরের দিকে। পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার বিকেল দু’টার দিকে একটি ভ্যানে করে কয়েকজন লোক চারটি ড্রাম নিয়ে এসে জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটসংলগ্ন রাস্তায় নামায়। এর মধ্যে দুটি ড্রাম তারা সেখানেই ফেলে রেখে দ্রুত সরে যায়। তখন কেউ তেমন গুরুত্ব না দিলেও সন্ধ্যার পর ড্রামগুলো থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। স্থানীয়রা বিষয়টি পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে ড্রাম খুলে দেখে, একটির ভেতর চাল ভর্তি আর অন্যটিতে রয়েছে মানুষের খণ্ডিত দেহ।

পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন, মরদেহটি ২৬ টুকরায় বিভক্ত করা হয়েছে এবং তা পরিকল্পিতভাবেই ড্রামের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভিকটিমের পরিচয় শনাক্ত করে। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার একটি হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

নিহত আশরাফুল হক নিহত হওয়ার দুই দিন আগে এক বন্ধুর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন ব্যবসায়িক কারণে। পরিবারের দাবি, তিনি তিন দিনের কাজের কথা বলে রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করেছিলেন। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছানোর একদিন পর থেকেই তার ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেও তারা কল্পনাও করতে পারেননি যে তাকে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে।

আশরাফুলের পরিবার অভিযোগ করেছে, তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গেই টাকার লেনদেন নিয়ে বিরোধ ছিল। তারা সন্দেহ করছেন—ঘটনায় ওই বন্ধুরই জড়িত থাকার সম্ভাবনা বেশি। পরিবারের পক্ষ থেকে শুক্রবার সকালে শাহবাগ থানায় আশরাফুলের বন্ধু জরেজকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ড অর্থনৈতিক লেনদেনজনিত বিরোধ থেকেই হতে পারে। তবে তারা এটাও বলছেন, মরদেহ যেভাবে খণ্ডিত করে রাখা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন। হত্যাকারী বা হত্যাকারীরা ঘটনাস্থলের আশপাশে সিসি ক্যামেরা এড়িয়ে কীভাবে ড্রামগুলো ফেলে গেছে তা নিয়েও পুলিশ ব্যাপকভাবে তদন্ত করছে। আশপাশের ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ভ্যানটি কোথা থেকে এসেছিল, কারা ড্রামগুলো এনেছিল—তা বের করতে পুলিশ তৎপর। পাশাপাশি সম্ভাব্য সকল সন্দেহভাজনের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

হাইকোর্টের মতো সুরক্ষিত এলাকায় এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড জনমনে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, “গোটা এলাকা জুড়ে পুলিশ থাকলেও কেউ কীভাবে এমন কাজ করে চলে গেল? যদি ভেতরে মরদেহ থাকে, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই দেখেছে বা জানে।” অনেক পথচারীর চোখে-মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট, বিশেষ করে রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল ড্রামে হয়তো কোনো মালামাল ফেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু ভেতরে যা পাওয়া গেল, তা কল্পনাতেও আসেনি।” তিনি জানান, মরদেহ যেভাবে টুকরো করা হয়েছে, তা দক্ষ ও অভিজ্ঞ হাতে করা বলে সন্দেহ আছে।

নিহতের গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, এলাকার মানুষজনও হতবাক। আশরাফুলের এক আত্মীয় বলেন, “সে জানায় শহরে বড় একটি পেমেন্ট কালেক্ট করতে গেছে। বলেছিল দুই দিনের মধ্যেই ফিরবে। কিন্তু আমরা ফেরত পেলাম তার খণ্ডিত দেহ। আমরা বিচার চাই।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তদন্তের অগ্রগতির স্বার্থে তারা এখনই সব তথ্য প্রকাশ করতে চাইছে না। তবে নিশ্চিত করা হয়েছে যে তারা হত্যাকারীদের ধরতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ড কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়; এটি সুপরিকল্পিত, সুসমন্বিত এবং সম্ভবত একাধিক ব্যক্তির অংশগ্রহণে সংঘটিত।

রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটতে থাকা ধারাবাহিক অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনা নিরাপত্তা চিত্রকেও আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নাগরিকরা বলছেন, “যদি হাইকোর্টের মতো জায়গায় এমনভাবে মরদেহ ফেলে রাখা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?”

এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতা, অর্থনৈতিক বিরোধ, সামাজিক অবক্ষয়—এসবের মাঝেই হারিয়ে গেল এক পরিশ্রমী ব্যবসায়ীর জীবন। ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, নগর জীবনে নৃশংসতার ছায়া কতটা গভীরভাবে ঢুকে পড়েছে।

শেষ পর্যন্ত, আশরাফুল হকের পরিবারের মতোই পুরো দেশের মানুষের একটাই প্রশ্ন—কারা তাকে হত্যা করল? কেন এমন নিষ্ঠুরভাবে দেহ টুকরো টুকরো করা হলো? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—হত্যাকারীরা কি আইনের আওতায় আসবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। আর উত্তর পাওয়ার আগ পর্যন্ত, রাজধানীর আকাশে ভাসছে উদ্বেগের কালো মেঘ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত