প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা বহুল আলোচিত মামলার রায় আজ সোমবার ঘোষণা হতে যাচ্ছে। জাতীয় জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ ও বিভীষিকাময় দুই মাসের ঘটনার পর এই রায়কে ঘিরে সারাদেশে চরম উত্তেজনা, প্রত্যাশা এবং গভীর উদ্বেগ একইসঙ্গে দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার—বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম। সেই অর্থে আজকের দিনটি ঐতিহাসিক, পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বেঞ্চ আজ রায়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন, অভিযুক্ত তিনজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত, হাজার হাজার নথিপত্র, শতাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং হাজারো ছবি-ভিডিও যাচাইয়ের পর ট্রাইব্যুনাল আজ তাদের সিদ্ধান্ত শুনাবে। গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহত ও আহতদের পরিবার, যারা গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের আশায় প্রতীক্ষায় আছেন, আজকের রায় যেন তাদের হৃদয়ের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি ছাড়াও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বর্তমানে আরও অসংখ্য মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জুলাই-আগস্টের ঘটনার পর সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন থানা ও আদালতে তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হতে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, নিহতদের পরিবার, আহতরা এবং রাজনৈতিক কর্মীরা অভিযোগ করেন, সেই সময়কার দমন-পীড়ন ছিল পরিকল্পিত, রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত এবং ক্ষমতাসীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই তা সংঘটিত হয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর গত এক বছরে পুলিশ, আদালত এবং বিভিন্ন স্বাধীন অনুসন্ধান সংস্থার নথি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট ৫৮৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার ধরণও ভয়াবহ। এদের মধ্যে ৩২৪টি মামলা শুধুই হত্যার অভিযোগে। অভিযোগপত্রগুলোতে বলা হয়েছে, আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে গুলি চালানোর নির্দেশ, অপহরণ, নিপীড়ন, হত্যাচেষ্টা, দমন-পীড়নের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্দেশদাতা। বহু মামলায় তাকে ‘হুকুমদাতা’, ‘পরিকল্পনাকারী’ এবং ‘নির্দেশদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা অন্তত ছয়টি মামলা, যেগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারে থাকাকালে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ে জড়িত ছিলেন। যদিও তার দলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় হাসিনার বিরুদ্ধে আরও চারটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত অফিসে ইতোমধ্যেই জমা পড়েছে আরও অর্ধশত অভিযোগ, যেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পিরোজপুরের সুখরঞ্জন বালি নিখোঁজ হওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামের মাইকেল চাকমাকে হত্যাচেষ্টা, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে নিখোঁজ করার অভিযোগসহ আরও বেশ কিছু গুরুতর বিষয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের জুলাই-আগস্টের ঘটনায় সারা দেশে মোট ১ হাজার ৬১২টি মামলা হয়েছিল। এসব মামলায় হত্যাকাণ্ড, গুলি, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের হত্যাচেষ্টা ও নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ছয় শটি মামলা হত্যার অভিযোগে এবং বাকি এক হাজারেরও বেশি মামলা অন্যান্য অপরাধে দায়ের করা হয়েছিল।
এই সব মামলার মধ্যে শেখ হাসিনার নাম উঠে এসেছে ৫৮০টিরও বেশি মামলায়, যার মধ্যে হত্যার মামলা ৩২৪টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত অধিক সংখ্যক মামলায় দেশের কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়ার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি দেশের বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায়, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা একসঙ্গে প্রক্রিয়াধীন আছে।
এদিকে গত ২ জুলাই আদালত অবমাননার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়। তিনি এখন পলাতক আসামি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এ সাজা কার্যকর হয়নি, কিন্তু এটিও তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
আজকের রায় শুধু একটি মামলার রায় নয়—এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের প্রতীক, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের মানুষ তাই আজ তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশ আবারও নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।










