প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর নয়াপল্টনে সোমবার (১৭ নভেম্বর) বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো, জনজীবন বিপন্ন করা এবং অব্যবস্থাপনা ঢেকে রাখতে সরকারপন্থী সন্ত্রাসীরা বেআইনী কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা এবং রাস্তায় ককটেল বিস্ফোরণের পেছনে যে অর্থ ব্যবহার হচ্ছে, তা মূলত সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লুট হওয়া টাকার অংশ।
রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। পদ্ধা সেতুর নামে আরও হাজার কোটি টাকা সড়ক ও সরকারি প্রকল্পের নামকরণ করে লুটের টাকা ঢাকছে। এই লুটের টাকায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হরণ করছে। তারা বাসে আগুন দিচ্ছে, রাস্তায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “সাধারণ মানুষ আজকে মনে করছে যে, তারা নিরাপদ নয়। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, অফিসের কর্মচারী, পথচারী, ব্যবসায়ী—সকলেই এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্যই হুমকি নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। লুটের টাকা দিয়ে ভাঙচুর ও সন্ত্রাস চালানোর সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা দেশের জনগণের ওপর চরম অবিচার করছে।”
রিজভী সাংবাদিকদের জানান, শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাসে আগুন দেওয়ার এবং রাস্তায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। “আমরা শুধু এটুকুই চাই যে, আইন প্রণয়ক ও প্রশাসন সক্রিয় হোক। সাধারণ মানুষ যাতে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। কিন্তু এখন দেখছি, লুটের টাকায় সন্ত্রাসীরা দেশের শান্তি ও জননিরাপত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।”
তিনি সাংবাদিকদের সামনে উদাহরণও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “গত মাসে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বন্দর এলাকায় বাসে আগুন দেওয়া হয়েছিল। শুধু আগুনই নয়, সেগুলোতে ককটেল বিস্ফোরণও ঘটানো হয়েছে। যাত্রীরা আতঙ্কে পড়ে, জনজীবন অচল হয়ে যায়। এসব ঘটনায় কেউ এখনও দায়ী করা হয়নি, এবং পুলিশ প্রশাসনও তৎপর হচ্ছে বলে আমরা মনে করি না।”
বিএনপির সিনিয়র নেতা বলেন, “আমরা বারবার বলেছি যে, দেশের জনগণ আর দমন ও আতঙ্কের মুখোমুখি থাকতে চায় না। এখনকার অবস্থা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। দেশের জনগণ শান্তিতে থাকতে চায়। সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো, লুটের টাকা দিয়ে সন্ত্রাস চালানো, রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা—সবই গ্রহণযোগ্য নয়।”
রিজভী আরও বলেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড মূলত সরকারের নীতি এবং দুর্নীতির ফলাফল। তিনি বলেন, “সরকার যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হত, তবে সাধারণ মানুষের ওপর এই ধরনের চাপ পড়ত না। কিন্তু বর্তমান সরকারের দমননীতি ও দুর্নীতি দেশের মানুষকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। লুটের টাকাকে ব্যবহার করে জনগণের ওপর সন্ত্রাস চালানো হয়েছে, এটা আমরা মেনে নিতে পারি না।”
সংবাদ সম্মেলনের সময় তিনি উল্লেখ করেন, দেশের জনগণ আজকে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসহায় মানুষও নিরাপদ নয়। রাস্তায় চলাচল, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা—সবই এই সন্ত্রাসের কারণে প্রভাবিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “লুটের টাকা দিয়ে সন্ত্রাস চালানোর জন্য সাধারণ মানুষকে আজকাল আতঙ্কিত হতে হচ্ছে। এটা একেবারেই মানবিক ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি সাংবাদিকদের আশ্বাস দেন, বিএনপি এই পরিস্থিতিতে জনমুখী আন্দোলন চালিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রিজভী বলেন, “আমরা দেশের জনগণের নিরাপত্তা, শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে যে কোনো উপায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করব। লুটের টাকায় যে ধরনের সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে, সেটি বন্ধ করতে হবে। আমরা জনগণের পাশে আছি এবং তাদের সঙ্গে একযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করব।”
রিজভীর এই মন্তব্য দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের অভিযোগের সঙ্গে জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তারা বলছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে।
রাজধানীর সাধারণ মানুষও উদ্বিগ্ন। যাত্রীরা, ব্যবসায়ী ও পথচারীরা বলছেন, তারা নিরাপদে চলাচল করতে পারছেন না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এই উত্তেজনার কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। এক দোকানদার বলেন, “বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির খবর আমরা শুনেছি, কিন্তু রাস্তা বন্ধ করা, বাসে আগুন দেওয়া—সবই আমাদের জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আমরা চাই, প্রশাসন কঠোর হোক এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আরও অস্থির করে তুলছে। সাধারণ মানুষের জীবনে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা আরও উল্লেখ করেন, “সরকার এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেন, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর ভয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।”
সংবাদ সম্মেলনে রিজভী উল্লেখ করেন, বিএনপি জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সবসময় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি যোগ করেন, “আমরা চাই, দেশের মানুষকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারুক। লুটের টাকা দিয়ে সন্ত্রাস চালানো, জনজীবনে ভয় সৃষ্টি করা—এসবের কোনো স্থান নেই। আমরা জনগণের সাথে রয়েছি, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাব।”
এই সংবাদ সম্মেলন ও রিজভীর মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে যে তীব্র উদ্বেগ রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। বাসে আগুন দেওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ, মহাসড়কে অবরোধ—এসব ঘটনা কেবল আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। সাধারণ মানুষ এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে চাইছে, আর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের জন্য এটি একটি তীব্র বার্তা।