প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধ করতে এবং টেলিযোগাযোগ খাতে নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি শেষে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসি—১৬ ডিসেম্বর থেকে সারাদেশে জাতীয় ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর (NEIR) সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগ কার্যকর হলে অবৈধ, চোরাই, ক্লোনড বা অননুমোদিতভাবে দেশে প্রবেশ করা কোনো মোবাইল হ্যান্ডসেট আর স্থানীয় অপারেটরের নেটওয়ার্কে কাজ করতে পারবে না।
বিটিআরসি রোববার এক সরকারি বার্তায় জানায়, তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থাকে প্রতারণা, তথ্য চুরি ও জালিয়াতির ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখা। একই সঙ্গে দেশের বৈধ মোবাইল আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন খাতকে সুরক্ষা দিতে অবৈধ হ্যান্ডসেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ মোবাইল আমদানির কারণে প্রতিবছর সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে এবং বাজারে ক্লোনড বা পুনঃপ্রোগ্রামড হ্যান্ডসেট ব্যবহারের মাধ্যমে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
এনইআইআর চালুর পর নেটওয়ার্কে সংযুক্ত প্রতিটি মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর সিস্টেমে যাচাই হবে। যদি কোনো ডিভাইস বৈধ না হয়, তবে তা নেটওয়ার্ক থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তবে যারা ইতোমধ্যে কোনো ডিভাইস ব্যবহার করছেন, সেটি যদি বৈধ ও অবৈধ যাই হোক—সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে এবং চালু থাকবে। গ্রাহকের কোনো অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। এর ফলে বর্তমান ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি বা আতঙ্ক ছড়ানোর সুযোগ নেই।
বিটিআরসির বার্তায় আরও বলা হয়েছে, মোবাইল হ্যান্ডসেট কেনার আগে গ্রাহকদের নিজেরাই খুব সহজ উপায়ে ফোনটির বৈধতা যাচাই করতে পারবেন। এর জন্য মোবাইলে *#06# ডায়াল করে আইএমইআই নম্বর বের করতে হবে। এরপর ‘KYD’ লিখে একটি স্পেস দিয়ে সেই আইএমইআই নম্বর যুক্ত করে ১৬০০২ নম্বরে পাঠাতে হবে। ফিরতি বার্তায় জানিয়ে দেওয়া হবে সেটটি বৈধ নাকি অবৈধ। কমিশনের মতে, এই যাচাই প্রক্রিয়া সচেতন ভোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এনইআইআর-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য চাইলে বিটিআরসির হেল্পডেস্ক নম্বর ১০০-তে ফোন করেও জানা যাবে। পাশাপাশি সরবরাহ করা হচ্ছে *16161# সংক্ষিপ্ত ডায়ালিং সেবা, যা ১৬ ডিসেম্বর থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে। মোবাইল অপারেটরদের কাস্টমার কেয়ার নম্বর ১২১—এর মাধ্যমেও গ্রাহকরা তথ্য ও দিকনির্দেশনা পেতে পারবেন। কমিশন গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়েছে, যেসব বিষয় নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি থাকবে—তা এসব মাধ্যমেই জেনে নেওয়া যেতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ অবৈধ বা অনিবন্ধিত মোবাইল হ্যান্ডসেট ঢুকে পড়ে। অনেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে ফোন আনলেও তা সঠিকভাবে রেজিস্ট্রেশন না করায় অনেক ডিভাইস পরে নেটওয়ার্কে সমস্যায় পড়ে। এনইআইআর চালু হলে এ ধরনের পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে। বিদেশ থেকে আনা ফোনের ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া রাখা হবে, যাতে ব্যবহারকারীরা বৈধভাবে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারেন।
চোরাই বা ক্লোনড হ্যান্ডসেট যে শুধু আর্থিক ক্ষতি করে তাই নয়, অপরাধীরা এগুলো ব্যবহার করে সহজেই পরিচয় গোপন করতে পারে। ডিজিটাল প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি বা সাইবার অপরাধে এমন ফোনের ব্যবহার বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ফলে এনইআইআর চালুর মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিটিআরসি জানিয়েছে, স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি ছিল—বহুদিন ধরেই—বাজারে অবৈধ সেটের দৌরাত্ম্য কমানো হবে। কারণ এই ধরনের হ্যান্ডসেট দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে বৈধ ব্যবসায়ে ক্ষতি হয় এবং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এনইআইআর চালু হলে এই অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
দেশের সাধারণ ব্যবহারকারীদের মাঝে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরছে তা হলো—পুরনো হ্যান্ডসেট দিয়ে কি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যাবে? বিটিআরসি নিশ্চিত করেছে যে যেসব ফোন ইতোমধ্যে দেশের নেটওয়ার্কে চলমান রয়েছে—সে ফোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে এবং কোনো ধরনের সমস্যায় পড়বে না। তবে নতুন ফোন কেনার সময় অবশ্যই বৈধতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক হবে। এতে ক্রেতারা যেন প্রতারণা বা মিথ্যা তথ্যের শিকার না হন, সে বিষয়েও কঠোর নজর দেওয়া হচ্ছে।
অবৈধ হ্যান্ডসেট আমদানিকারক ও চোরাই ফোনের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিটিআরসি। কমিশন বলছে, বাজারে বৈধ ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং গ্রাহকদের নিরাপদ সেবা নিশ্চিত থাকে—সেই লক্ষ্যে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলবে।
দেশে ডিজিটাল সেবা বিস্তৃত হচ্ছে, মানুষ এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ—সবকিছুই করে থাকে। এই বাস্তবতায় মোবাইল ডিভাইস নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনইআইআর চালু হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন শুধু প্রয়োজন ভোক্তা সচেতনতা, বিক্রেতাদের নিয়ম মেনে হ্যান্ডসেট বিক্রি এবং অপারেটর-ব্যবস্থা সমন্বয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই তিনটি ক্ষেত্র সমন্বয় হলে বাংলাদেশ টেলিকম খাতে প্রবেশ করবে এক স্বচ্ছ ও নিরাপদ অধ্যায়ে, যেখানে অবৈধ ফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না এবং দেশের রাজস্ব ক্ষতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
১৬ ডিসেম্বর—বিজয়ের মাসেই—শুরু হচ্ছে এই উদ্যোগের যাত্রা। ডিজিটাল নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং বৈধতার নতুন ধাপ হিসেবে এটি বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।