প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে আলোচিত দুটি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হচ্ছে। একদিকে চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের শেষ দিন নির্ধারিত হয়েছে। অপরদিকে আশুলিয়ার ঘটনায় ছয় মরদেহ পোড়ানো ও সাতজনকে হত্যার অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ষোলজনের বিরুদ্ধে চলছে অষ্টাদশ দিনের শুনানি। বহু আলোচিত ও সংবেদনশীল এই দুই মামলায় আজকের সাক্ষ্য গ্রহণকে বিচারপ্রক্রিয়ার এক মোড় ঘোরানো দিন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চানখারপুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত বছরের জুলাই-আগস্টের উত্তাল অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনরত সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা চানখারপুল এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন আকস্মিকভাবে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ঘটনাস্থলে ছয়জন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য পরিকল্পিতভাবে ও অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সে সময় দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কিংবা গুলিবর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এই মামলায় আজ সাক্ষ্য দেবেন রাষ্ট্রপক্ষের মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম। তার সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ২৬ জন সাক্ষী বিভিন্ন তথ্য, দলিল, ভিডিওফুটেজ এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আদালতে বিবৃত করেছেন। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিহতদের গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি, হাসপাতালের করিডরে ছুটোছুটি, এবং ঘটনার পর শহরে নেমে আসা গভীর আতঙ্কের চিত্র। অনেকেই বলেছেন, ঘটনাটি শুধু একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মানবিক বিপর্যয়ও ছিল।
ট্রাইব্যুনাল–১–এর বিচারক প্যানেলের সভাপতিত্ব করছেন বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার। আদালত গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিতভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ করে এ মামলার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করছেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আজকের সাক্ষ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন, কারণ মূল তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য মামলার সামগ্রিক কাঠামোয় যুক্ত করবে শেষ ধাপের প্রমাণসমূহ। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ দাবি করছে যে, মামলার অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ঘটনার সময় অনেক বিবরণই বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ ছিল। আদালত এসব বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শুনছেন।
অন্যদিকে আশুলিয়ার মামলাটি আরও নির্মমতার অভিযোগ নিয়ে সামনে আসে। সেখানে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানকালে পুলিশি অভিযানের সময় সাতজনকে হত্যা করা হয় এবং ছয়টি মরদেহ একটি গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার ভয়াবহতার কারণে আশুলিয়া এলাকায় তখন সাধারণ মানুষ আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ায়। যারা দূর থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখেছিলেন, তাদের অনেকেই পরদিনও ঘটনাস্থলে যেতে সাহস পাননি। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং মরদেহ ধ্বংসের মাধ্যমে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা।
এই মামলায় আসামির সংখ্যা ১৬ জন, যার মধ্যে আটজন বর্তমানে গ্রেফতার অবস্থায় আছেন। তাদের আজ সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে হাজির করা হয়। ট্রাইব্যুনাল–২–এ বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ইতোমধ্যেই অনেক প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, এবং ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা আদালতে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, শিগগিরই রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেবেন সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হক, যিনি এই মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে জানিয়েছেন যে, ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর নির্দেশ ছিল মরদেহগুলো দ্রুত ধ্বংস করে ফেলতে এবং কেউ যাতে ছবিও তুলতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে। তার এই বক্তব্য মামলার প্রমাণপত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আশুলিয়ার ঘটনাটি শুধু বিচারিক দিক থেকেই নয়, মানবিক দিক থেকেও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছেন ন্যায়বিচারের জন্য। তারা প্রায়ই আদালতে এসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান যে, তাদের প্রিয়জনরা কার কী ক্ষতি করেছিল, কেন তাদের ওপর এমন নির্মম অত্যাচার চালানো হলো—আজও তার উত্তর তারা খুঁজে পান না। মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিধ্বস্ত এসব পরিবার বিচারপ্রক্রিয়াকে দেখছেন তাদের সন্তানের প্রতি দেশের দায়বদ্ধতা ও সম্মান প্রদর্শনের একমাত্র উপায় হিসেবে।
এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, তদন্তে বহু অসঙ্গতি রয়েছে। তারা দাবি করছেন, সেটি রাজনৈতিক পরিবেশে সংঘটিত একটি জটিল ঘটনা, এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী করা হলে সেটি হবে বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার। আদালত সব পক্ষের বক্তব্য নিরপেক্ষভাবে শুনছেন এবং প্রতিটি সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।
দুটি মামলাই দেশের মানুষকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা এই বিচার প্রক্রিয়ার ওপর গভীর নজর রেখেছেন। তারা মনে করছেন, বিচারিক স্বচ্ছতা ও সত্য উদঘাটনের এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। গত বছরের উত্তাল অভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যে ভয়, বিভ্রান্তি ও মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল—সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা জরুরি।
আজকের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে দুটি মামলাই যাবে বিচারপর্বের পরবর্তী ধাপে। বিচারের ফলে কারা দায়ী এবং কী শাস্তি তারা পাবেন—এই প্রশ্নের উত্তর এখন পুরো দেশের নজরে। আদালত জানিয়েছে, প্রত্যেকটি প্রমাণ, প্রতিটি সাক্ষ্য এবং উভয় পক্ষের যুক্তি নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করেই রায় দেওয়া হবে। দেশের বিচারব্যবস্থা মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেবে না—এমন বার্তা দিতেই যেন আদালতের এ ধৈর্যশীল, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া।