প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক খান ও রফিজ উদ্দিন মোল্লা সম্প্রতি দ্বৈত গেজেটের জটিলতায় মিডিয়ার শিরোনামে এসেছেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) তাদের অতিরিক্ত গেজেট বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৩ নভেম্বর জামুকার ১০০তম সভায়। তবে গেজেট বাতিলের খবরকে কেন্দ্র করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানি করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, আবদুল মালেক খান সাবেক সেনা সদস্য হওয়ায় তার নামে দুটি গেজেট তালিকাভুক্ত রয়েছে—একটি সামরিক গেজেট এবং একটি বেসামরিক গেজেট। তিনি কেবল বেসামরিক গেজেটের অধীনে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেছেন। সামরিক গেজেট থাকা সত্ত্বেও তিনি তা জানতেন না। জামুকার সম্প্রতি নেওয়া সিদ্ধান্তে তার অতিরিক্ত সামরিক গেজেট বাতিল করা হয়েছে। তবে বেসামরিক গেজেট নম্বর-১৯৪৬ এখনো বহাল আছে এবং তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন।
আবদুল মালেক খান জানান, তিনি নবম সেক্টরের বাবুগঞ্জ অঞ্চলের যুদ্ধকালীন বেইজ কমান্ডার আবদুল মজিদ খানের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে প্রতাবপুর মিলিশিয়া ক্যাম্পে অস্ত্র সমর্পণ করে সনদপত্র গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি নেন। ২০০০ সালে বেসামরিক গেজেটে তালিকাভুক্ত হন এবং তার থেকেই ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছেন।
চাঁদপাশা ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিজ উদ্দিন মোল্লার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। তার বেসামরিক গেজেট বাতিল করা হলেও লাল মুক্তিবার্তা গেজেটে তার নাম এখনো বহাল আছে। সম্প্রতি বীর নিবাস নির্মাণের সময় জমি সংক্রান্ত বিরোধে তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। রফিজ উদ্দিন মোল্লা বলেন, তার সকল যুদ্ধকালীন প্রমাণপত্র ও সনদপত্র থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় একটি মহল তাকে মানহানির চেষ্টা চালাচ্ছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার আবদুল করিম হাওলাদার বলেন, জামুকার সভায় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা শুধুমাত্র একাধিক গেজেট থাকায় অতিরিক্ত গেজেট বাতিলের জন্য। এটি মানে নয় যে উভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ভুয়া। তারা সর্বত্র স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা। স্থানীয় দ্বন্দ্ব থাকলেও সেটি তাদের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে না।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, গেজেট বাতিলের কারণে কোনো মুক্তিযোদ্ধার অধিকার বা মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়নি। সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস ও অবদানের মূল্যায়ন রাখা হচ্ছে এবং তাদের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা হবে।
এ ঘটনায় এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, গেজেট বাতিলের তথ্য ভুল বোঝার কারণে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা রক্ষা করতে স্থানীয় জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবদান ও সংগ্রামকে কোনও ধরনের দ্বন্দ্ব বা স্থানীয় রাজনৈতিক সংঘাতের মাধ্যমে হেয়প্রতিপন্ন করা উচিত নয়। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলও এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে, অতিরিক্ত গেজেট বাতিলের মাধ্যমে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ভুয়া বানানো হয়নি।
এই ঘটনা একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট ও স্বীকৃতি সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতাকে জনমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো এড়িয়ে আইন ও প্রমাণপত্রের ভিত্তিতে সমাধান করা জরুরি। জেনুইন মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা সমাজের দায়িত্ব।